ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের তৈরি রাজনৈতিক সংকটে চাপে পড়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। তবে এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের একটি ঐতিহাসিক রায় তাঁর হাতে এনে দিয়েছে আরও বড় ক্ষমতা ও প্রভাব। গত বুধবার (৭ মে) পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সামরিক আদালতে সাধারণ নাগরিকদের বিচার বৈধ ঘোষণা করে একটি রায় দেয় যা সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকে আরও মজবুত করেছে।
এর আগে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্ট সামরিক আদালতে বেসামরিক নাগরিকদের বিচারকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করেছিল। তবে এবার সাত সদস্যের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ ৫-২ ভোটে সেই রায় বাতিল করে দিয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৩ সালের ৯ মে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে সেনা স্থাপনায় হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত বেসামরিক ব্যক্তিদের সামরিক আদালতে বিচার করার আইনগত পথ উন্মুক্ত হলো।
দেশটির প্রধান সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, এই রায়ের মাধ্যমে পাকিস্তান আর্মি অ্যাক্টের যেসব ধারা পূর্বে বাতিল হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) অভিযোগ করেছে, ৯ মের ঘটনার পর দলটির প্রায় এক হাজার কর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এদের অনেককে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই তুলে নেওয়া হয়। দলটি এই রায়কে ‘অস্ত্রায়িত রায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পিটিআইয়ের সংসদ সদস্য ওমর আইয়ুব খান রায়টি নিয়ে বলেন, “এই রায় এমন দিনে এলো, যখন তথাকথিত সরকার ও সামরিক প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় সংহতি’ গড়ার কথা বলছে।” তিনি ভারতের সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রসঙ্গও টানেন। পিটিআইয়ের সিন্ধু প্রদেশ প্রধান হালিম আদিল শেখ এই রায়কে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে অন্যায় ঢাকার কৌশল’ বলেও অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস-এর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আইনি পরামর্শদাতা রীনা ওমর এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “দেশের সর্বোচ্চ আদালত যেভাবে বিচারব্যবস্থার সামরিকীকরণে সায় দিচ্ছে, তা ভয়াবহ হলেও অনুমেয়।” তাঁর মতে, এই রায় একটি অশুভ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
এই রায়ের পটভূমিতে রয়েছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা। ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, আসিম মুনিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য যাতে তিনি হিন্দু ও ভারতের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন তা দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জগুলার ভেইন’ বা ‘জীবনরেখা’ হিসেবে উল্লেখ করে ‘দ্বিরাষ্ট্র তত্ত্ব’-এর প্রসঙ্গ পুনরায় উত্থাপন করেন এবং বলেন, “ভারতীয় বাহিনীর যেকোনো সামরিক অভিযান কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।” তাঁর এই বক্তব্য দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই উত্তেজনার পাশাপাশি বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এমন এক সময়ে, যখন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ছে তখন সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের হাতে বিরোধ দমন করার জন্য একটি নতুন আইনি হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই রায় পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে।

