২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহের ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা মামলায় কারাবন্দি ৪০ জন বিডিআর সদস্যকে জামিন দিয়েছেন আদালত।
গত ৮ মে ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক ইব্রাহিম মিয়া এ আদেশ দেন। সোমবার (১২ মে) আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী শাহাদাৎ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মো. বোরহান উদ্দিন জানিয়েছেন, জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত, এমনকি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও রয়েছেন। তবে যাদের জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে, আদালত তাদের মামলার নথিপত্র খতিয়ে দেখে সন্তুষ্ট হয়েছেন বলেই এই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাকি আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে।
জামিন পাওয়া ৪০ জন আসামির মধ্যে রয়েছেন—রেজাউল করিম, শাজাহান, রফিকুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, মো. শামীম, ওয়ালি উল্লাহ, হাবিবুর রহমান, তারিকুল ইসলাম, বনি আমিন চৌধুরী, মো. এ বারিক, ইমতিয়াজ আহমেদ নবীন, মোয়াজ্জেম হোসেন, মিজানুর রহমান, সিদ্দিকুর জামান জোয়ার্দার ওরফে লিটন, মো. এ মোনাফ, আকিদুল ইসলাম, খলিলুর রহমান, কৌতুক কুমার সরকার, মো. সালাউদ্দিন, সোহরাব হোসেন, কামাল হোসেন, মো. ইশহাক, দারুল ইসলাম, শ্রী সুমন চক্রবর্তী, আবু সাঈদ, সেজান মাহমুদ, মো. সেলিম, বিধান কুমার সাহা, মাসুম হাসান, ফিরোজ মিয়া, শ্রী তাপস কুমার বিশ্বাস, কামাল মিয়া, নূর-এ-আলম মিয়া, এনামুল হক, শফিকুল ইসলাম, রবিউল আলম এবং আল আমিন।
এর আগে, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি একই ট্রাইব্যুনাল ১৭৮ জন বিডিআর সদস্যকে জামিন দেয়। এরপর ২৩ জানুয়ারি কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে তারা মুক্তি পান।
মামলার পটভূমিতে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআরের সদর দপ্তরে ভয়াবহ বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় দুটি মামলা হয়—একটি হত্যা, অন্যটি বিস্ফোরক আইনে। হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়, যেখানে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২৭৮ জন আসামি খালাস পান।
২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর এই হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। তাতে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। হাইকোর্টে রায়ের আগেই ১৫ জনসহ মোট ৫৪ জন আসামির মৃত্যু হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২২৬ জন আসামি আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টে ৮৩ জনের খালাস এবং সাজা কমানোর রায়ের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল করেছে। বর্তমানে এসব আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, বিস্ফোরক আইনের মামলায় ২০১০ সালে ৮৩৪ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরু হয়, যা এখনো চলমান। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় তদন্ত পুনরায় শুরুর দাবি জোরালো হচ্ছে। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা এই অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ ডিসেম্বর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে সরকার, যাকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
২০০৯ সালের এই ভয়াবহ বিদ্রোহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। মামলার জটিলতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং নতুন করে তদন্ত শুরুর উদ্যোগ সব মিলিয়ে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা এখনও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

