গত বছরের জুলাই-আগস্টে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস আন্দোলনের সময় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা। এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় গণহত্যার কোনো উপাদান নেই বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ‘মাস্টারমাইন্ড’, ‘হুকুমদাতা’ এবং ‘সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে তিনি এসব অপরাধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এটি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রথম কোনো মামলার তদন্ত সম্পন্ন হওয়া।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে উঠে আসা তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। এরপর শুরু হবে বিচারিক কার্যক্রম।
তাজুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী এই ঘটনায় গণহত্যার উপাদান নেই। তাঁর ভাষায়, “যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলো ‘ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এটি গণহত্যা নয়। এটি ম্যাস কিলিং বা ম্যাসাকার হিসেবে চিহ্নিত করা যায় তবে জেনোসাইড বলা যাবে না।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “গত রাতেই সংশোধিত আইন এসেছে। এখন তদন্ত সংস্থা মনে করলে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত কি না তা অনুসন্ধান করে দেখবে। আইনের বিধান অনুযায়ী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।”
২০১০ সালের ২৫ মার্চ, শেখ হাসিনার সরকারের সময়েই মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হলে আইন সংশোধন করে ট্রাইব্যুনালের আওতা বিস্তৃত করা হয়। সংশোধিত আইনের আওতায় এখন শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সেই সময়কার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা এক নম্বর অভিযোগটি তার উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ে। চিফ প্রসিকিউটর জানান, ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ‘রাজাকারের বাচ্চা’, ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’, ‘রাজাকার’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে প্ররোচনামূলক বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকে দেন।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা ‘অক্সিলারি ফোর্স’ বা সহায়ক বাহিনী হিসেবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা, আহত এবং নির্যাতন করে। এসব ঘটনাই মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উসকানি, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তাজুল ইসলাম।
এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের সম্মুখীন করার নজির। এতে রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ অতিক্রম করবে দেশটি।

