বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন সংক্রান্ত আপিলের শুনানি আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চে এই শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। দলটির আইনজীবীরা আশাবাদী, আপিল বিভাগের রায়ে নিবন্ধন ফিরে পেলে তাদের নির্বাচনী প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ও ফিরে পেতে পারেন। প্রতীক ফেরত চেয়ে আলাদাভাবে একটি আবেদনও করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে, কারণ সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা বাতিল করা হয়েছিল। যদিও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই সিদ্ধান্ত ছিল প্রশাসনিক, কোনো আদালতের রায় নয়। তাই আপিল বিভাগের রায় হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে তা বেশি কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ হবে, ফলে প্রতীক ফেরত পাওয়া আইনি দিক থেকে সম্ভব।
সাবেক নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ও খ্যাতনামা আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, “ফুলকোর্টের সিদ্ধান্ত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এটি কোনো আদালতের রায় নয়। তাই যদি আপিল বিভাগ জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক ফেরত দেওয়ার রায় দেন, তাহলে তা কার্যকর হবে। এতে আইনি কোনো বাধা থাকবে না।”
জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রতীক হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ ব্যবহার শুরু হয় ১৯৮৬ সালের পর থেকে। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন দলটিকে সাময়িকভাবে নিবন্ধন দেয়। তবে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের তৎকালীন মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ জন হাইকোর্টে রিট করে এই নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন।
২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ সেই নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে। তখন আদালত বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত। তবে জামায়াতকে সরাসরি আপিল করার অনুমোদনও দেওয়া হয়। আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ওই বছরের ৫ আগস্ট জামায়াতের রিট খারিজ করে দেন। পরে ২ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে জামায়াত নিয়মিত আপিল করে।
এই রায়ের ফলে দলটি ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি এবং পরে বিএনপি জোটের অংশ হিসেবে ভোটও বর্জন করে। এরপর একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে তৎকালীন ইসি দলটির নিবন্ধন বাতিল করে। ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর ইসি সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমদের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতেই জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
নিবন্ধন বাতিলের পর ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক আর কাউকে বরাদ্দ না দিতে বলে। চিঠিতে বলা হয়, ‘দাঁড়িপাল্লা’ সুপ্রিম কোর্টের মনোগ্রামে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই এটি অন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার অনুচিত। বিভ্রান্তি এড়াতে সেই চিঠির ভিত্তিতে ইসি ২০১৭ সালের ৯ মার্চ ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক বাদ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করে।
তবে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের জন্য প্রতীক হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং ২০০৮ সালের নিবন্ধনের সময়ও সেই প্রতীক রাখা হয়। তার মতে, প্রতীক বাতিলের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫০টি এবং প্রতীকও সংরক্ষিত ৫০টি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত প্রতীক ২৫টি। এসবের মধ্যে ‘দাঁড়িপাল্লা’ নেই। এ অবস্থায় দলীয় নিবন্ধন ও প্রতীকের অভাবে জামায়াত দীর্ঘদিন স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে পারছে না। এমনকি ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর কোনো আইনজীবী উপস্থিত না থাকার অজুহাতে আপিল বিভাগ জামায়াতের আপিল খারিজ করে দেন।
এরপর ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সাবেক সরকার জামায়াত ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। পরে জামায়াত আপিল বিভাগে তাদের নিবন্ধন মামলাটি পুনরায় শুনানির আবেদন করে। সর্বোচ্চ আদালত সে অনুযায়ী মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে শুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।
জামায়াতের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “আমরা নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রতীক ফিরে পেতে দরখাস্ত আকারে আবেদন করেছি। আশা করছি, রায়ে নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রতীক ফিরে পাওয়ার বিষয়টিও নিষ্পত্তি হবে।” তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট সভার রেজ্যুলেশন একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যার আইনগত ভিত্তি নেই। তাই আদালতের রায়ে প্রতীক ফেরত দিতে নির্বাচন কমিশনের কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার যুক্তি তুলে ধরে শিশির মনির বলেন, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে আইন করে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে। তখন জামায়াত আবেদন করলে নির্বাচন কমিশন তাদের সাময়িক নিবন্ধন দেয় এবং গঠনতন্ত্রে কিছু সংশোধনের নির্দেশ দেয়। সেই প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় রায় দিয়ে নিবন্ধন বাতিল করা হয় যা কমিশনের এখতিয়ারবহির্ভূত হস্তক্ষেপ।
তিনি আরও বলেন, হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, সেটির বিরুদ্ধে করা আপিল একটি সার্টিফায়েড আপিল। অর্থাৎ হাইকোর্ট নিজেই স্বীকার করেছেন, এতে সংবিধানের জটিল ব্যাখ্যা জড়িত। তাই এটি সরাসরি আপিল বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত।
শিশির মনির আরও বলেন, হাইকোর্টের তিন বিচারকের মধ্যে একজন উল্লেখ করেছেন, রিটকারী সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর এই রিট করার এখতিয়ার নেই। কারণ তার নিজের দলের (তরীকত ফেডারেশন) গঠনতন্ত্র আরও বেশি ত্রুটিপূর্ণ। সেই দল কোনোভাবেই জামায়াতের গঠনতন্ত্র চ্যালেঞ্জ করার অধিকার রাখে না।
সবশেষে, শিশির মনির বলেন, জামায়াত অতীতে প্রায় সব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বও ছিল। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দল গঠন করা একটি সাংবিধানিক অধিকার যা কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে খর্ব করা যায় না। তাই তিনি আশাবাদী, আজকের শুনানিতে দলটি নিবন্ধনসহ প্রতীকও ফিরে পাবে।
এখন দেখার বিষয়, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে রাজনৈতিক ইতিহাসে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যত কীভাবে নতুনভাবে আবির্ভূত হয়।


