মাগুরার আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় আগামী শনিবার ঘোষণা করবেন আদালত। অভিযোগ গঠনের মাত্র ২১ দিনের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ায় এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে দ্রুত নিষ্পত্তিকৃত মামলার একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মামলাটি নিয়ে জনমনে চরম উদ্বেগ থাকায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নজরদারিও ছিল এই মামলার ওপর।
মঙ্গলবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মাগুরা জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম মুকুল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয় আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। উভয় পক্ষের আইনজীবীরা এতে অংশ নেন এবং মামলার চার আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অ্যাটর্নি জেনারেলের মর্যাদাপ্রাপ্ত প্রবীণ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজীকে। তিনিও যুক্তিতর্কে অংশ নেন এবং শুনানি শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “এই মামলায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, মেডিকেল রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দিতে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। আমরা আশাবাদী, দোষীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে। এই রায় ভবিষ্যতে এমন অপরাধের বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।”
রাষ্ট্রপক্ষের পিপি মনিরুল ইসলাম জানান, মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করেছে। আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের বক্তব্যও শুনেছেন। এর মধ্যে গত ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি চলে আসছে। মামলার পুরো কার্যক্রম আদালতে আসামিদের সরাসরি উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়েছে।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় শিশুটির বোনের শ্বশুরের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় (ধর্ষণের ফলে মৃত্যু ঘটানো) অভিযোগ আনা হয়। একইসঙ্গে শিশুটির বোনের স্বামী ও ভাশুরের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারার দ্বিতীয় অংশে (ভয়ভীতি প্রদর্শন) এবং বোনের শাশুড়ির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় (অপরাধের আলামত নষ্ট করা) অভিযোগ গঠন করা হয়।
মামলার তদন্ত শুরু হয় শিশুটির মৃত্যুর আগেই। ৮ মার্চ শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। এর আগেই, ৬ মার্চ সকালে শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয় যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
১৫ মার্চ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সব্যসাচী রায়ের আদালতে শিশুটির বোনের শ্বশুর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ৬ মার্চ সকালে নিজের ছোট ছেলের কক্ষে শিশুটিকে একা পেয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করার চেষ্টা করেন তিনি।
তদন্ত শেষে ১৩ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলাউদ্দিন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর ১৭ এপ্রিল মামলাটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয় এবং ২০ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরু হয়।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার প্রত্যাশা করছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ও ভুক্তভোগী পরিবার। আগামী শনিবার দেওয়া রায়ে আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন সেটিই এখন দেখার বিষয়।

