২০০১ সালের বাংলা নববর্ষের দিনে রমনার বটমূলে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মাওলানা তাজ উদ্দিন ও শাহাদাতউল্লাহ জুয়েলের সাজা হাইকোর্টে এসে কমে গিয়ে হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। একইসঙ্গে মামলার বাকি ৯ আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ মে) বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
এই মামলার শুনানির প্রথম পর্ব হয় গত ৮ মে। সেদিন বিচারকরা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা পর্যালোচনা করে রায়ের একটি অংশ পাঠ করেন। বাকি অংশ ঘোষণার জন্য তারা ১৩ মে তারিখ নির্ধারণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করা হয়।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল সকালে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন উপলক্ষে ছায়ানটের আয়োজনে রমনার বটমূলে জমায়েত হয় হাজারো মানুষ। অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। হামলায় আহত হন অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ।
এ ঘটনার পরই নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই হামলার পেছনে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি) সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়। তারা হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে।
বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৪ সালের ২৩ জুন বিচারিক আদালত এ মামলায় রায় ঘোষণা করেন। আদালত কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এরপর নিয়ম অনুযায়ী মামলাটি ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি আসামিরাও নিজেদের সাজা চ্যালেঞ্জ করে জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন। এসব আবেদন ও রায়ের পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট আজ মঙ্গলবার নতুন রায় ঘোষণা করে।
এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলো। তবে এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও দ্রুততা আনার দাবি বরাবরই উঠে এসেছে। কারণ, এমন জঙ্গি হামলা শুধু নিরীহ মানুষকে প্রাণহানির শিকার করেনি, বরং দেশের সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার ওপরও এক ভয়াবহ আঘাত হানে।

