ঢাকার একটি পারিবারিক আদালতে বৃহস্পতিবার ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এক দম্পতির একমাত্র ছেলে রাইয়ানকে কার জিম্মায় রাখা হবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতে এ তৈরি হয় এক বিশেষ আবেগঘন পরিস্থিতি।
আদালত প্রথমে রায় দিয়েছিল, শিশু রাইয়ান তার মায়ের শারমিন রিমার জিম্মায় থাকবে। তবে আদেশ অনুযায়ী রাইয়ানকে আদালতে আনা হলে সে স্পষ্ট জানায়, মায়ের কাছে সে যেতে চায় না। তার ভাষায়, “মা আমাকে মারে। মা নিজেই আমারে বের করে দিয়েছে।”
এ অবস্থায় শিশুটির কান্না, ভয় আর অনীহা দেখে আদালত রায় পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। আদালতের বিচারক তখন ‘ক্যামেরা ট্রায়াল’-এ একান্তে রাইয়ানের সঙ্গে কথা বলেন এবং তার অভিমত জানার চেষ্টা করেন। শিশুটি তখন জানায়, সে বাবার কাছেই থাকতে চায়। আদালত শেষপর্যন্ত রায় পরিবর্তন করে আগামী ১৮ জুন পর্যন্ত তাকে বাবার জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন।
এই রায় ঘোষণার পরই আদালতের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শারমিন রিমা। তিনি ছেলেকে বারবার “সোনা, সোনা” বলে ডাকতে থাকেন এবং জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেন। তবে রাইয়ান তখন মায়ের কাছে যেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং দূরে সরে দাঁড়ায়।
শারমিন তখন বলেন, “২৫ দিনে আমার ছেলেটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। ও ওর বাবার শেখানো কথা বলছে।” উত্তরে রাইয়ান বলে, “তুমিই তো আমাকে দিয়ে দিছো। বাবা কিছু শেখায়নি।”
মায়ের কান্নাজড়ানো কণ্ঠে তখন ভেসে আসে আরও এক বেদনাবিধুর কথা, “তোরে ছাড়া আমি ঘুমোতে পারি না। তুই আমার শরীরে পা না দিলে, জড়ায়ে না ধরলে ঘুমাইতে পারি না। তুই মা আর এই জীবনে দেখবি না। আমি ওকে ছাড়া পটুয়াখালী যাব না। যাওয়ার সময় গাড়ির নিচে লাফ দেব।” এই কথায় আতঙ্কিত হয়ে রাইয়ান আরও দূরে সরে যায় মায়ের কাছ থেকে।
রায় ঘোষণার পর শিশুটির বাবা কামাল আহমেদ বলেন, “ঢাকায় আসার পর থেকে ও আমাকে বলছে, ‘বাবা, তুমি আমাকে মায়ের কাছে পাঠাবে না তো? মা আমাকে ফেলে দিয়েছে, মারছে।’”
ঘটনার পেছনের গল্প আরও জটিল। ২০১৫ সালের ১৫ জুন শারমিন রিমা ও কাপড় ব্যবসায়ী কামাল আহমেদের বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই তাদের মধ্যে কলহ শুরু হয়। কামালের দাবি, শারমিন ঢাকায় থাকতে চাইলেও ঘরের কাজ করতেন না যা নিয়ে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হতো।
২০১৭ সালে জন্ম নেয় রাইয়ান। এরপর শারমিন একাধিকবার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী চলে যান। এক পর্যায়ে কামাল অভিযোগ করেন, শারমিন অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং কামালের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে একটি সালিশি বৈঠকে বিষয়টি আপস মীমাংসা হয় এবং তাঁরা আবার ঢাকায় ফিরে আসেন।
কিন্তু কিছুদিন পর শারমিন আবার পটুয়াখালী ফিরে গিয়ে কামালকে তালাক দেন। আদালত তখন ছেলের ভরণপোষণ বাবদ কামালকে প্রতি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা দিতে বলেন। কামালের অভিযোগ, শারমিন ছেলেকে ঠিকমতো খাওয়াতেন না স্কুলে ভর্তি করেননি।
২০২২ সালের ২০ অক্টোবর কামাল ছেলেকে আনতে শারমিনের বাড়িতে গেলে, শারমিন তাঁকে ‘ছেলেধরা’ বলে মারধরের হুমকি দেন। ব্যবসায় মন্দা থাকায় কামাল পরে নিয়মিত ভরণপোষণের টাকা দিতে পারেননি। শারমিন তখন লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ করেন। আদালত নতুন করে ভরণপোষণ নির্ধারণ করে এবং কামালকে ছেলেকে মাসে ৩-৪ বার দেখার অনুমতি দেয়। কিন্তু কামালের দাবি, শারমিন তাঁকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দিতেন না এমনকি ফোনেও কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো না।
শেষপর্যন্ত শারমিন নিজেই রাইয়ানকে গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। তবে সেখানে সে লেখাপড়ায় মনোযোগ না দিয়ে দুষ্টুমি করত এবং যথাযথ যত্ন না পাওয়ায় কামাল ছেলেকে নিজের কাছে চেয়ে আদালতে মামলা করেন।
এই মামলারই পরিণতি আজ আদালতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। আদালতের অভ্যন্তরে একটি বিচ্ছিন্ন পরিবারের কষ্ট, এক শিশুর ভীতসন্ত্রস্ত মন আর মা-বাবার টানাপড়েনের এই চিত্র হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আইনের শাসনের পাশাপাশি একটি শিশুর মানসিক চাহিদা, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

