বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা। তারা মনে করেন, একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শুক্রবার (১৭ মে) সিলেট বিভাগের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। সভাটি অনুষ্ঠিত হয় সিলেটে, যেখানে বিভাগের চারটি জেলার সকল পর্যায়ের বিচারকগণ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
সভায় বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। তবে বিচার বিভাগের কাঠামোগত দুর্বলতা, বাজেটে অপ্রতুল বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বিচারকাজ পরিচালনায় গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। জেলা আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত ক্ষমতা এখনো নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকায় বিচার বিভাগ প্রায়শই অযাচিত হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হচ্ছে, যা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করছে।
সভায় উপস্থিত বিচারকগণ প্রধান বিচারপতির ঘোষিত বিচার বিভাগ সংস্কারের রোডম্যাপ অনুসারে দ্রুত একটি পৃথক ‘বিচার বিভাগীয় সচিবালয়’ গঠনের দাবি জানান। এই সচিবালয়ের অধীনে বিচারকদের পদ সৃষ্টি, বাজেট প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক বিষয়াদি পরিচালনার প্রস্তাব দেন তারা।
সভায় আলোচকরা মাসদার হোসেন মামলার ৬ নম্বর নির্দেশনার আলোকে একটি স্বতন্ত্র পে-কমিশন গঠনের দাবিও জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। তারা বলেন, বিচারকরা সংবিধানের রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই তাদের সম্মানী এমন হওয়া উচিত যা সেই দায়িত্বের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে প্রতিফলিত করে। বিচারকদের জন্য পৃথক ‘জুডিসিয়াল জাতা’ প্রবর্তন এবং বর্তমান বেতন স্কেলের ৩০ শতাংশ হারে বকেয়া প্রদানসহ পূর্ববর্তী পে-কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
জেলা আদালতের বিচারকদের উচ্চ আদালতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আলোচকগণ বলেন, জ্যেষ্ঠতা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে জেলা আদালত থেকে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তারা মনে করেন, ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে বিচার বিভাগের ভিত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
সভায় বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনকে বিচারকদের স্বার্থ সংরক্ষণে একটি কার্যকর ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। বক্তারা বলেন, বিচার বিভাগের আধুনিকীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। উপস্থিত বিচারকরা এসব উদ্যোগের প্রশংসা করে অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ হেমায়েত উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আমিরুল ইসলাম।
বিচারকগণ এক অভিন্ন কণ্ঠে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কাঠামোগত সক্ষমতা এবং মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তাদের মতে, বিচার বিভাগকে পৃথক সচিবালয়ের আওতায় এনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথকে আরও সুদৃঢ় করাই হবে দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

