প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ হারানো ঠিক হবে না। তবে বিচার বিভাগের সংস্কার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরও নির্ভরশীল। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কারণে বিচার বিভাগে দ্বৈত শাসন চলছে যা সংশোধন জরুরি।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট বার অডিটোরিয়ামে ‘মাসদার হোসেন মামলা: ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের শেষ লড়াই ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইশতিয়াক সেন্টার। অনুষ্ঠানে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের স্মরণ করা হয়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা এখন এক সংকটকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে আইনশৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র দুর্বল হবে। এই সুযোগ হারালে তা ইতিহাসের এক অপূরণীয় ব্যর্থতা হবে।”
তিনি ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের অবদানও স্মরণ করেন। ১৯৯৯ সালের মাসদার হোসেন মামলার মূল দর্শনে ইশতিয়াকের ছাপ স্পষ্ট। বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণের কাঠামোগত চিন্তা আজও আমাদের পথপ্রদর্শক। এছাড়া ১৯৮৯ সালের অষ্টম সংশোধনী মামলাসহ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণায় ইশতিয়াকের অবদান অপরিসীম। তাঁর আত্মজীবনী “দি ইশতিয়াক পেপার্স” সেই ইতিহাসের প্রমাণ।
বিচার বিভাগ সংস্কারের রোডম্যাপ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে উন্মোচন হবে। তার মূল স্তম্ভ হবে সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। প্রধান বিচারপতি বলেন, “বিচার বিভাগ ধারকাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারে না। নিজেদের স্বাধীন পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাই আলাদা সচিবালয় এখন সময়ের দাবি।”
তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বশাসনের জন্য ইতোমধ্যে নেওয়া প্রধান পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন:
- সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্ডিন্যান্স ২০২৫
স্বতন্ত্র নিয়োগ কাউন্সিল গঠন করে বিচারপতি নিয়োগের রাজনীতি পরিহার করা হয়েছে। - বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা,
প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের প্রথম পদক্ষেপ। - সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল
বিচারপতিদের জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করছে। - বিচারক বদলি ও পদায়নে নিরপেক্ষতা
বদলি নির্ভর করবে মেধা ও দক্ষতার ওপর, চাপের ভিত্তিতে নয়। - কার্যপ্রণালী উন্নয়ন ও ডিজিটালাইজেশন
পরিবার আদালত প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল আদালত ব্যবস্থা ও সহায়তা হেল্পলাইন চালু। - আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব
ইউএনডিপি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের সহযোগিতায় উন্নত বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে
তবে প্রধান বিচারপতি দুটি বড় বাধার কথাও তুলে ধরেন:
- পুরনো স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিকূলতা
বিচার ও রাজনীতির দীর্ঘদিনের যোগসূত্র ভাঙা সহজ নয়। - টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
রাষ্ট্রের সব স্তরে সৎ রাজনৈতিক মনোভাব প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সংবিধানের ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের কারণে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে দ্বৈততা রয়ে গেছে। ব্যারিস্টার ইশতিয়াকের যুক্তি তুলে ধরে বলেন, অনুচ্ছেদ ১১৬-এর ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দ আদালত নয়, বিচারক নিয়ন্ত্রণকেও নির্দেশ করে। সঠিক প্রয়োগ না হলে তা অর্থহীন হয়ে যাবে। চিফ জাস্টিস মোস্তফা কামালের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পরামর্শ’ শব্দটি নামমাত্র থাকলে তা কেবল বাঁশের খুঁটির মতো হবে। আসল অর্থ হলো— সুপ্রিম কোর্টের মতামতই চূড়ান্ত। তিনি আরও বলেন, এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
সভায় অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, বার কাউন্সিল ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদিন, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সিনিয়র আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী, নিহাদ কবির, মোস্তাফিজুর রহমান খানসহ দেশের শীর্ষ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংবিধান গবেষক ও আপিল বিভাগের আইনজীবী অরিফ খান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। উল্লেখ্য, ১২ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। ২০০৩ সালে তিনি প্রয়াত হন। তিনি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও দুই দফা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিরপেক্ষতা ও নিষ্ঠার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চিন্তাধারা কখনো তার কাজের পথে বাধা হয়নি। তার ছেলে বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

