গত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশের আর্থিক খাত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ঋণখেলাপিদের মাধ্যমে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত তিনজন সাবেক গভর্নর এবং চারজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি দুদকের উপপরিচালক মোমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য চাওয়া হয়। দুদকের মহাপরিচালক (প্রিভেনশন) ও সংস্থার মুখপাত্র মো. আখতার হোসেন বলেন, “আর্থিক অনিয়ম নিয়ে আমাদের কয়েকটি দল কাজ করছে। তদন্ত শেষ হলে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর পাওয়া ফলাফল যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।”
দুদক সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, ফজলে কবির এবং আব্দুর রউফ তালুকদার। এছাড়া সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, এস এম মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান এবং আবু ফারাহ মোহাম্মদ নাসেরের নামও রয়েছে। তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক কাজী সাইদুর রহমানের তথ্যও চেয়েছে কমিশন।
এই নয়জন বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তারা দায়িত্বে থাকাকালে নতুন ব্যাংক অনুমোদন, ঋণ নীতিমালা প্রণয়ন, বিতরণ, অর্থপাচার, রিজার্ভ থেকে ডলার ছাড় এবং এসব বিষয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তের নথিপত্র চেয়েছে দুদক।
এছাড়া ২০০৯ সাল থেকে ঋণ খেলাপিদের পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় যেসব প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়েছে, তাদের তালিকাও চাওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—বেক্সিমকো গ্রুপ, এমআর গ্রুপ, রতনপুর গ্রুপ, কেয়া গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বিবিএস গ্রুপ, আবদুল মোনেম লিমিটেড, অ্যানোনটেক্স গ্রুপসহ আরও কিছু কোম্পানি। দুদক এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নাম, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, ঋণের পরিমাণ ও বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়েছে।
২০০৯ সালের পর অনুমোদন পাওয়া ৯টি নতুন ব্যাংক সম্পর্কেও তথ্য চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো—মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্মার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক)।
দুদক এই ব্যাংকগুলোর অনুমোদনের সময় দেওয়া নোটিশ, সার্কুলার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়েছে। এছাড়া সালমান এফ রহমানের একটি চিঠির জবাবে ২০১৫ সালের ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা, ২০০৯ সালের পর ব্যাংক পরিদর্শন নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট সব নথির সত্যায়িত অনুলিপি চাইছে দুদক।
ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন ও অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সব নথিপত্র ও সার্কুলারের অনুলিপিও চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব বিষয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে থাকলে, সেই প্রতিবেদনও দিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “দুদক আমাদের কাছে বেশ কয়েকটি চিঠি পাঠিয়েছে। আমরা প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহের চেষ্টা করছি।”

