বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো চেক। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, এনজিও কিংবা কর্পোরেট সেক্টর—সবক্ষেত্রেই চেক একটি আস্থাভিত্তিক আর্থিক দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই আস্থা কিছু অসাধু ব্যক্তির কৌশলগত প্রতারণার সুযোগ করে দেয়। স্বাক্ষরিত সাদা চেক আদায় বা প্রতারণার মাধ্যমে গোপনে রাখা প্রায়ই ঘটে। ফলে চেকের মূল মালিকের আর্থিক ক্ষতি হওয়ার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।
চেক প্রতারণার ঘটনায় সাধারণত দেওয়ানি মামলা বা ১৩৮ ধারার অধীনে ডিজঅনার মামলা হয়। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া অনেক সময় যথেষ্ট প্রতিকার দিতে পারে না। তাই জরুরি ভিত্তিতে চেক উদ্ধার ও তা আদালতের হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন হয়। এই ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ সালের ৯৮ ধারা কার্যকর আইনগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৯৮ ধারা মূলত তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করে অবৈধ বস্তু, জাল দলিল, চোরাই মাল বা অশ্লীল সামগ্রী উদ্ধারের বিধান দেয়। তবে আদালতের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই ধারা মূল্যবান অর্থনৈতিক দলিল যেমন চেক উদ্ধারেও প্রযোজ্য হয়েছে। ধারায় বলা হয়েছে, জেলা বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যদি অনুসন্ধানে সন্তুষ্ট হন যে কোথাও চোরাই মাল, জাল দলিল বা অশ্লীল বস্তু রয়েছে, তাহলে তল্লাশি পরোয়ানা ইস্যু করে সেই জায়গায় তল্লাশি ও জব্দের নির্দেশ দিতে পারেন। ৯৮(২) উপধারায় জাল কয়েন ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ সম্পর্কেও বিধান রয়েছে।
চেক আইন অনুযায়ী, চেক জালিয়াতি বা প্রতারণা ফৌজদারি অপরাধ। যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণার মাধ্যমে চেক আদায় করে বা মালিকের অজ্ঞাতে চেক অবৈধভাবে দখল করে, তখন সেটি ‘অবৈধ দখল’ হিসেবে গণ্য হয়। যদি ওই চেক কোনো অফিস, বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে গোপনে রাখা হয় এবং মালিকের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ৯৮ ধারার মাধ্যমে চেক উদ্ধার সম্ভব।
- এক ব্যক্তি এনজিও থেকে চাকরি ছাড়ার সময় প্রভিডেন্ট ফান্ড বুঝিয়ে না দিয়ে জোর করে সাদা চেকে স্বাক্ষর করান। পরে সেই চেক দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। তিনি ৯৮ ধারায় আবেদন করলে ম্যাজিস্ট্রেট তল্লাশি পরোয়ানা জারি করে অফিস থেকে চেক উদ্ধার করেন এবং আদালতের হেফাজতে রাখেন।
- আরেক ব্যবসায়িক চুক্তিতে দেওয়া পোস্ট-ডেটেড চেক বাতিলের পরও অপর পক্ষ চেকটি ফেরত না দিয়ে জমা দেওয়ার চেষ্টা করে। মালিক ৯৮ ধারার আশ্রয় নেন। ম্যাজিস্ট্রেট সত্যতা যাচাই করে পরোয়ানা জারি করেন। পুলিশ চেক উদ্ধার করে আদালতে হস্তান্তর করে।
৯৮ ধারার মাধ্যমে চেক উদ্ধারের পাশাপাশি এর অপব্যবহার প্রতিরোধও সম্ভব। আদালতের হেফাজতে রাখা চেক অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারে না। ভবিষ্যতে চেকটি মামলা আলামত হিসেবে কাজে লাগবে। প্রকৃত মালিক আদালতের মাধ্যমে চেক ফেরত পেতে পারবেন। তবে ৯৮ ধারায় আবেদন করার সময় অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ ও প্রমাণ থাকতে হবে। চেকের অবস্থান ও অবৈধ ব্যবহারের সম্ভাবনা আদালতকে স্পষ্ট করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটকে সন্তুষ্ট করতে হবে যে এই পদক্ষেপ ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন। আদালতেরা আইন ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করেন, আইন যেখানে নির্দিষ্ট নয়, সেখানে উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনে বিচারিক ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ কারণেই ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত ৯৮ ধারার প্রয়োগে চেক উদ্ধার করে থাকেন।
আইনজীবীদের উচিত সঠিক তথ্য ও প্রমাণসহ অভিযোগ গঠন করা, চেকের অস্তিত্ব, দখল ও ক্ষতির যুক্তি তুলে ধরা এবং আদালতকে বুঝানো কেন ৯৮ ধারার প্রয়োগ জরুরি। চেক উদ্ধার ও নিরাপত্তায় ফৌজদারি কার্যবিধি ৯৮ ধারা শুধু ব্যক্তি অধিকার নয়, পুরো ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতারণার শিকার ব্যক্তি চেক হারালে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ভুল হলে ফৌজদারি দায়েও পড়তে পারেন। তাই দ্রুত ও সুরক্ষিতভাবে চেক উদ্ধার অপরিহার্য। ৯৮ ধারার মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেট চেক জব্দ করে আদালতের হেফাজতে রাখেন, যা অপব্যবহার রোধ ও মালিকের স্বার্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। এ ধারা আধুনিক আর্থিক প্রতারণার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৮ ধারা ঐতিহাসিকভাবে চোরাই মাল ও জাল বস্তু উদ্ধারে ব্যবহৃত হলেও এখন আর্থিক জালিয়াতির ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ব্যাপক ও কার্যকর। চেক লেনদেনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৯৮ ধারার সঠিক প্রয়োগ আইনজীবী, বিচারক ও নাগরিকদের সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্বের উপর নির্ভরশীল।

