মব সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং তা ধীরে ধীরে একটি সামাজিক প্রবণতায় রূপ নিচ্ছে। শুরুতে যেটিকে আকস্মিক উন্মত্ততা মনে হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আইন প্রয়োগের অপেক্ষা না করে মানুষ নিজেই বিচারক হয়ে উঠছে—এই প্রবণতা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন মানুষ পীর হোক বা সাধারণ নাগরিক—তার পরিচয় যাই হোক না কেন, তাকে হত্যা মানে একটি জীবন শেষ করে দেওয়া। রক্তপাতের এই বাস্তবতা সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা, বিচারহীনতার দীর্ঘ সংস্কৃতি এবং নৈতিক অবক্ষয়—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়ায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। প্রতিটি সংখ্যা একটি জীবনের প্রতীক, একটি পরিবারের গল্প। আরও উদ্বেগজনক হলো—এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বেশিরভাগই ঘটেছে প্রকাশ্যে। এতে স্পষ্ট হয়, অপরাধীরা শাস্তির ভয় তেমন অনুভব করছে না।
ঢাকায় মব সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্রেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। ঘটনাগুলোর ধরনও বৈচিত্র্যময়—কখনও ধর্মীয় অভিযোগ, কখনও রাজনৈতিক পরিচয়, কখনও গুজব, আবার কখনও তুচ্ছ ঘটনা থেকেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। বসুন্ধরা এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে গাড়ি থেকে টেনে এনে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এ বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সহিংসতায় রূপ নেয়, যেখানে কেউ প্রতিবাদ করেনি, কেউ থামানোর চেষ্টা করেনি।
এই পরিস্থিতির মূল প্রশ্ন—মানুষ কেন নিজেই বিচারকের ভূমিকা নিচ্ছে? এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা। যখন রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে চায়। কিন্তু এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত অপরাধকেই সামাজিক স্বীকৃতি দিচ্ছে।
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, এসব সহিংসতা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ খবর পড়ে, ভিডিও দেখে সাময়িক প্রতিক্রিয়া জানালেও দ্রুত তা ভুলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও প্রায় একই—ঘটনার পর বিবৃতি, তদন্ত কমিটি, তারপর নীরবতা। এই নীরবতা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের পরোক্ষ উৎসাহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার শূন্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের পুনর্গঠন ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা জরুরি, যদিও এ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
মব সহিংসতা শুধু শারীরিক আক্রমণ নয়; এটি মানসিক বিকৃতিরও বহিঃপ্রকাশ। সন্দেহ বা অভিযোগই যেন এখন কারও বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠছে। ‘চোর’, ‘নাস্তিক’ বা ‘অন্য দলের’ তকমা লাগলেই জনতা সহিংস হয়ে উঠছে—যা সমাজের জন্য গভীর বিপদের ইঙ্গিত।
এছাড়া প্রশ্ন উঠছে—এই সহিংসতা কি পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি এর পেছনে কোনো প্ররোচনা কাজ করে? অতীতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ বা রাজনৈতিক সহিংসতা—এসব অনেক সময় ‘জনতার ক্ষোভ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে কারা আছে, কারা লাভবান হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
সমাধানের পথ রয়েছে, তবে তা সহজ নয়। প্রথমত, মব সহিংসতাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে হবে, পরিচয় বিবেচনা না করে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পুনর্গঠন জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্টভাবে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্র কি নাগরিকদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি উত্তেজিত জনতার চাপে নীরব থাকবে? যদি নীরবতা বজায় থাকে, তবে এই সহিংসতা আরও বিস্তৃত হবে এবং নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে সবার জন্যই।
এই পরিস্থিতিকে আর বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন সমাজের নৈতিক অবস্থার একটি বড় পরীক্ষা। সময় এখনো হাতে আছে, তবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

