কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে মানব পাচার চক্রের দৌরাত্ম্য ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থার নিয়মিত অভিযান, উদ্ধার কার্যক্রম এবং পাচারকারীদের গ্রেফতার সত্ত্বেও থামছে না এই অবৈধ কার্যক্রম। বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে ভিকটিম উদ্ধার হলেও নতুন করে মানুষ পাচারের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এতে উপজেলার বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সাগরে মানববোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় বাড়ছে নিখোঁজ ও স্বজনহারা মানুষের সংখ্যা।
টেকনাফ পৌর শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়ার বাসিন্দা মো. ইউসুফের পরিবারও এমনই এক ট্র্যাজেডির শিকার। তার বড় ছেলে মো. রিদুয়ান (২৭) মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সাগরপথে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু সেই যাত্রাই তার জীবনের শেষ খোঁজে পরিণত হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রিদুয়ান ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি ফেরেন। এরপর স্থানীয় এক ব্যক্তির প্রলোভনে পড়ে তিনি বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি থেকে বের হন এবং কচ্ছপিয়া এলাকার আরেক মানব পাচার চক্রের সদস্য দালাল জাফরের মাধ্যমে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। যাত্রার সময়ও দালালের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
রিদুয়ানের বাবা মো. ইউসুফ বলেন, “আমার ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে সবার বড় সন্তান রিদুয়ান। সে ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি আসে। এরপর এলাকার এক ব্যক্তির খপ্পরে পড়ে গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কচ্ছপিয়া এলাকার আরেক অন্যতম মানব পাচার চক্রের সদস্য দালাল জাফরের মাধ্যমে সাগরপথে বড় ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা করে। ট্রলারে ওঠার পরও দালালের মাধ্যমে কথা হয় তার সঙ্গে।”
তিনি আরও দাবি করেন, ৯ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় আনুমানিক ২৫০ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জন জীবিত উদ্ধার হন। তবে ওই উদ্ধার হওয়া তালিকায় তার ছেলে রিদুয়ানের কোনো সন্ধান মেলেনি। এখন ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় দিন কাটছে তার।
নিখোঁজ রিদুয়ানের মা শাহিনা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলে বিয়ে করেছে এখনো এক বছর হয়নি। তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যায় সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে কোনো খবর পাচ্ছি না আমার ছেলের। দালালের মাধ্যমে যেতে চেয়েছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সাগরে মাঝপথেই ডুবে গেল সে স্বপ্ন। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমার ছেলের লাশটি চাই। আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, সে জন্য দালালদের খুঁজে বের করে কঠিন শাস্তি দেওয়া হোক।”
টেকনাফে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। স্থানীয়দের মতে, দালালচক্রের প্রলোভন ও অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি বারবার প্রাণহানি ও পরিবার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাচারকারীরা উপজেলার বিভিন্ন উপকূলীয় নৌঘাট ও সংলগ্ন এলাকাকে নিয়মিতভাবে তাদের কার্যক্রমে ব্যবহার করছে।
চিহ্নিত এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে সাবরাং ইউনিয়নের শাহ পরীরদ্বীপ, মিস্ত্রিপাড়া, ঘোলাচর, পশ্চিমপাড়া এবং সাবরাং কাটাবনিয়া নৌঘাট, খুরেরমুখ, মুন্ডার ডেইল ও বাহারছড়া নৌঘাট। একইসঙ্গে নোয়াখালীপাড়া, শীলখালী, বড় ডেইল, কচ্ছপিয়া, মাথাভাঙ্গা নৌঘাটও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, তুলাতলী, লম্বরী, হাবিবছড়া, রাজরছড়া এবং মিঠাপানির ছড়া নৌঘাটও এই তালিকায় রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড শাহ পরীরদ্বীপ বিসিজি আউটপোস্টের চিফ পেটি অফিসার এম শামছুল আলম মিয়ার বাদী হয়ে করা এজাহারে বলা হয়, গত ৯ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী সমুদ্রে কয়েকজন মানুষকে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পায়। তারা ড্রাম ও কাঠের টুকরা ধরে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।
পরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধিমালা অনুসরণ করে জাহাজটি উদ্ধার অভিযান চালায়। এতে মোট ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি এবং এক নারীসহ ৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক ছিলেন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা টেকনাফ ও উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বলে জানা যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা গত ৪ এপ্রিল এফবি তানজিনা সুলতানা নামের একটি বড় ফিশিং বোটে করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পথে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বোটটি ডুবে গেলে তারা সমুদ্রে ভেসে থাকেন। পরে তাদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কোস্টগার্ড সূত্রে আরও জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জন মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং বাকি ৩ জন পাচারের শিকার। এ তথ্যের ভিত্তিতে ১১ এপ্রিল রাত ১টা ৪৫ মিনিটে অভিযান চালিয়ে ৬ জন মানব পাচারকারীকে আটক করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহ পরীরদ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবকসহ সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভনে ফাঁদে ফেলে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব, দাওয়াত বা কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ডেকে নেওয়া হয়। পরে কৌশলে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে গিয়ে ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়।
এরপর একটি অংশকে সাগরপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পাচার করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো চক্রটি অত্যন্ত সংগঠিত। এতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ভুক্তভোগীদের আস্তানায় নেয়, আবার কেউ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে নৌঘাটে পৌঁছে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, চক্রটির শীর্ষ পর্যায়ের গডফাদাররা গোপন স্থানে বসে মোবাইল ফোনে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। আর্থিক লেনদেনের বড় অংশই বিকাশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইল, সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, কচ্ছপিয়া ও রাজারছড়া এলাকা থেকে দালালচক্রের মাধ্যমে তাদের ছোট ছোট নৌকায় তুলে একটি বড় ট্রলারে একত্র করা হয়।
প্রায় ২৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। যাত্রার প্রায় চার দিন পর এটি আন্দামান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর যাত্রীরা পানির ড্রাম, তেলের ট্যাংক, ফোম ও কাঠের টুকরো ধরে প্রায় দুই দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে এবং কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। তবে এখনো বহু যাত্রীর খোঁজ না মেলায় স্বজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ভিকটিমদের বড় অংশই মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী, যারা টেকনাফ এলাকায় বসবাস করছিলেন। তাদের আর্থসামাজিক দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রটি উন্নত জীবন, উচ্চ বেতনের চাকরি এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের চেষ্টা চালায়। অভিযোগ অনুযায়ী, উদ্দেশ্য ছিল জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা এবং নারী পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা।
এ ঘটনায় মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইন ২০১২-এর ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আরও ১০-১৫ জন অজ্ঞাত সদস্য একটি সংঘবদ্ধ পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া একমাত্র নারী উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এর রাহেলা বেগম জানান, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার জন্য তার খালাতো ভাই ক্যাম্প থেকে দালালদের আস্তানায় নিয়ে যান। পরে ৪ এপ্রিল তারা যাত্রা শুরু করেন।
রাহেলা বেগম বলেন, যাত্রার চার দিন পর হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি ডুবে যায়। ওই ট্রলারে প্রায় ২০ জন নারী ছিলেন। তিনি একটি ফোম ও কাঠ ধরে ভেসে থাকেন এবং পরে একটি জাহাজ তাকে ও আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করে। তার খালাতো ভাই ওই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলেও তিনি জানান।
একই ঘটনায় উদ্ধার হওয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মো. রফিক জানান, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ২ এপ্রিল তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে একটি ঘরে আটকে রেখে তার হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে একটি বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়, যেখানে প্রায় ২৪০ জন ভুক্তভোগী এবং ২০ জন দালাল ছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল সকালে প্রচণ্ড বাতাসে একের পর এক ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। অনেকেই সেখানেই মারা যান, কেউ কেউ সাগরে ভেসে থাকেন। তিনি একটি পানির বোতল ধরে বেঁচে থাকেন এবং পরে একটি তেলবাহী জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।
এদিকে নিখোঁজ শিক্ষার্থী সাদেকের মা মদিনা বেগমের অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও মানবিক ট্র্যাজেডিতে রূপ দিয়েছে। তিনি জানান, তার ছেলে সাবরাংয়ের সিকদারপাড়ার বাসিন্দা এবং নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। আব্দুল আমিন নামের এক ব্যক্তি তার অজান্তে ছেলেকে জোর করে ট্রলারে তুলে দেয়।
মদিনা বেগম বলেন, প্রথমে তাকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। পরে তিনি জানতে পারেন তার ছেলে ট্রলারে রয়েছে। এরপর দালাল ফোনে ট্রলারডুবির কথা জানিয়ে আবার আড়াই লাখ টাকা দাবি করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকা দেওয়ার পর থেকে ওই দালালের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনি তার ছেলেকে জীবিত অথবা অন্তত মরদেহ ফিরে পেতে চান। একইসঙ্গে দালালদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৪ নভেম্বর রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লম্বরী এলাকার মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় দালাল ফয়সালের লিজ নেওয়া একটি সুপারি বাগানে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা হয়েছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে থানা-পুলিশ অভিযান চালায়।
অভিযানকালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় চারজনকে আটক করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে ৩ জন নারী ও ৯ জন শিশুসহ মোট ১২ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। তবে ফয়সাল (২৫), আজিমুল্লাহ (২৭), ইসমাইল (২৬), ফেরদৌস আক্তার (৩৮), মো. ইউনুছ (২১), মো. রফিক (১৯), সাইফুল্লাহ (৪০)সহ আরও কয়েকজন এবং অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জন সদস্য পালিয়ে যায় বলে পুলিশ জানায়।
আরও জানা যায়, গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাতে একই এলাকার দক্ষিণ লম্বরী সাইফুলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ৩০ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ২২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ১ জন শিশু ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টেকনাফ সদর ইউনিয়নে সাইফুল, ইসমাইল, ফয়সাল, ইয়াছিন, গফুর ও নুর নবী মাঝিসহ একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সহযোগীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা এবং স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসে।
এরপর তাদের পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এই চক্রগুলো অপহরণ, পাচার ও জিম্মি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাম্প্রতিক নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজদের বিষয়ে তদন্তে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কথিত মানব পাচারকারীদের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্র বলছে, অনেকের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অপহরণ, ডাকাতি ও মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ট্রলারডুবির ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছে এবং তাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।
সরেজমিনে নিখোঁজ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহারছড়া ইউনিয়নের চৌকিদারপাড়ার রিদুয়ান, সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েত উল্লাহ (১৭), ফিরুজ (২৫), মো. রাসেল (২৬), আরাফাত (২৬), মো. আব্দুল মাহবুদ (৩০) এবং সাবরাং ৪ নম্বর ওয়ার্ড সিকদারপাড়ার সাদেকসহ একাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন।
পরিবারগুলোর দাবি, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী পাচারকারীর সহযোগীরা নানা প্রলোভনে এসব মানুষকে সংগ্রহ করে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক পরিবার ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পায় না বলেও জানা গেছে। তাদের অভিযোগ, পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ মো. রাসেলের মা হামিদা খাতুন ছেলের খোঁজে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় দুই মানব পাচারকারী তার ছেলেকে একই এলাকার বাসিন্দা জাফরের হাতে তুলে দেয়।
হামিদা খাতুন বলেন, খবর পেয়ে তিনি জাফরের কাছে গিয়ে বারবার অনুরোধ করেন। তিনি হাত জোড় করে, এমনকি পায়ে ধরে পর্যন্ত বলেন—যত টাকা লাগে তিনি দেবেন, শুধু যেন তার ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তার আকুতি-মিনতির পরও জাফর কোনো সহযোগিতা করেননি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। যারা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে নিখোঁজ ছেলে রাসেলকে দ্রুত খুঁজে বের করে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানান।
একই এলাকার নিখোঁজ ফিরুজের স্ত্রী জান্নাতুল ইমা জানান, ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার স্বামী ঘর থেকে বের হন। বের হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর ফোন করে বলেন, “আমি চলে যাচ্ছি, দোয়া করিও।” এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তিনি বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় তার স্বামীও থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন। কারণ এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। জান্নাতুল ইমা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা প্রলোভন দেখিয়ে তার স্বামীকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
এদিকে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি বাংলাদেশের সীমানার বাইরে সংঘটিত হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন। নিখোঁজদের পরিবারের কাছ থেকে একাধিক মানব পাচারকারীর নাম পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওসি আরও বলেন, প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিখোঁজদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, সর্বশেষ টেকনাফ উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। আটকরা হলেন শাহ পরীরদ্বীপ কোনাপাড়া এলাকার ইসমাইল, দক্ষিণপাড়ার ফারুক এবং সাবরাং মুন্ডার ডেইল এলাকার ইব্রাহিম। গত রবিবার গভীর রাতে শাহ পরীরদ্বীপ ও সাবরাং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
সব মিলিয়ে নৌকাডুবি ও মানব পাচারের এই ধারাবাহিক ঘটনায় টেকনাফের উপকূলীয় অঞ্চলে শোক, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে।

