Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice বুধ, এপ্রিল 22, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » শিক্ষকদের দুর্দশা—ইউনূস আমলের ভয়াবহ চিত্র
    অপরাধ

    শিক্ষকদের দুর্দশা—ইউনূস আমলের ভয়াবহ চিত্র

    নিউজ ডেস্কUpdated:এপ্রিল 22, 2026এপ্রিল 22, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    বদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল কান্না, আর্তচিৎকার আর প্রাণভিক্ষার অনুনয়। “ও ভাই… আমরা শিক্ষক মানুষ, আমরা রাজনীতি করি না। আমরা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। ভাই, আমাদের মাইরেন না ভাই। আমাদের ওপর হামলা কইরেন না ভাই! ও ভাই… আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান…”

    একই সঙ্গে ঘরের ভেতর কেউ দৌড়াচ্ছেন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। কেউ আবার মোবাইল ফোনে সাহায্যের জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। বাইরে থেকে দরজায় একের পর এক সজোরে আঘাত পড়ছে। ধারালো অস্ত্রের কোপে কাঠের দরজা ফেটে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটি কোনো চলচ্চিত্র নয়।  ৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়েছে বাস্তব এই ভয়াবহ মুহূর্ত।

    ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১৮ আগস্টের। সেদিন বরিশালের গৌরনদীতে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর স্টাফ কোয়ার্টারের প্রধান শিক্ষকের বাসায় হামলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে ঘরের ভেতরে আটকে রেখে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে শতাধিক ব্যক্তি। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তির মেয়ে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদৃতা অধিকারী ফেসবুক লাইভে ঘটনার দৃশ্য দেখাতে শুরু করেন। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

    সেদিন প্রাণে বেঁচে ফিরলেও এরপর শুরু হয় আরেক অধ্যায়। চাপের মুখে জোর করে তাকে পদত্যাগ করানো হয় বলে অভিযোগ। এরপর থেকেই কার্যত এক ধরনের নির্বাসিত জীবন কাটাতে হচ্ছে প্রণয় কান্তি অধিকারীকে। বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনের পথ, শুরু হয় অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতা।

    সেই দিনের স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে তাকে। ১৯ এপ্রিল দুপুরে অজ্ঞাত স্থান থেকে ফোনে তিনি বলেন, আমার প্রাণের ক্যাম্পাসের ভেতরে আমাকে সপরিবারে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে—এ কথা যতবার ভাবি, আমার গা শিউরে ওঠে।”

    তার অভিযোগ, আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কথা বলে কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন। তিনি বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত নন এবং কখনোই রাজনীতি করেননি। তার ভাষায়, “আমার দোষ একটাই—আমি কড়া প্রশাসক, কোনো অনিয়ম সহ্য করিনি। তাই আমাকে অপরাধী বানিয়ে শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করা হয়েছে।”

    তিনি আরও জানান, দীর্ঘ দৌড়ঝাঁপের পর গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তার বেতন-ভাতা চালু হলেও এখনো নিরাপত্তার কারণে তিনি স্কুলে ফিরতে পারেননি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন জানান, হামলার সময় বাড়িটির প্রায় সব দরজাই ভেঙে ফেলা হয়। পরে ফেসবুক লাইভে ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তার ভাষায়, “লাইভ না হলে কী হতো, তা ভাবতেই ভয় লাগে।”

    একই প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহিদুল্লাহ বলেন, একজন শিক্ষক সমাজ গঠনের কারিগর হলেও আজ সেই শিক্ষকই ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার পরিবার এখনো সেই দিনের আতঙ্ক বহন করছে। শুধু প্রণয় কান্তি অধিকারী নন, দেশের শিক্ষা খাতে এমন আরও বহু ঘটনা সামনে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যালয়ের অন্তত তিন হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং কয়েকজন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও একই ধরনের মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন।

    ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে ‘মবোৎসব’ শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক ট্যাগ বা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে অনেক শিক্ষককে অপমান, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা যায়।

    শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জেলা শিক্ষা অফিস—কোথাও এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় এবং শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই সময় সারা দেশে মবের শিকার হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা কমপক্ষে তিন হাজার।

    অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ১০০ শিক্ষকের বেতন ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে। তবে এখনো অনেক শিক্ষক স্বাভাবিকভাবে স্কুলে ফিরতে পারছেন না। নিরাপত্তা ও চাপের কারণে তাঁদের অনেকে কার্যত কর্মস্থল থেকে দূরে রয়েছেন।

    এদিকে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে কিছু শিক্ষক পুনরায় কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেন। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ শিক্ষক তখন স্কুলে যোগদান করেন এবং তাঁদের বেতনও পুনরায় চালু করা হয়। তবে এখনো প্রায় ৭০০ শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনিক দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেও তাঁরা যোগদান করতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও তাঁদের স্কুলে যেতে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

    অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ১২৩ জন শিক্ষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যাঁদের মবের মাধ্যমে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জন শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হয়েছে। সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজেও দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে পদত্যাগপত্র মবকারীরাই লিখে দিয়েছে। এরপর হুমকি-ধমকি দিয়ে, এমনকি হাত চেপে ধরে শিক্ষকদের স্বাক্ষর করাতে বাধ্য করার দৃশ্যও ধরা পড়েছে। স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও পাওয়া গেছে।

    শিক্ষকদের ওপর এমন হামলার বিষয়ে একবার মন্তব্য করেছিলেন তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন, “চর দখলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন।” তবে সেই বক্তব্যের পর কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকদের ওপর মব প্রতিরোধের দাবিতে শিক্ষক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশও করেছে। সাত দিনব্যাপী কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে শিক্ষকদের ওপর সংঘটিত মব-সহিংসতার ভয়াবহ ও নীরব এক চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    শিক্ষককে আক্রমণ করে জামা-কাপড় ছিঁড়ে অপদস্থ করা:

    ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নরোত্তমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ঘটে এক উত্তেজনাকর ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, সেদিন বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সাবেক সভাপতি মুক্তার হোসেনের নেতৃত্বে একটি মব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউনুস নবীকে জোর করে বাইরে বের করে দেয়।

    ঘটনাটি ঘটে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লার উপস্থিতিতেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, পরিস্থিতি তখনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল আবারও বিদ্যালয়ে গেলে ওই প্রধান শিক্ষককে মারধরের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তাঁর পরনের কাপড়ও ছিঁড়ে ফেলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

    ইউনুস নবীর অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় সাবেক সভাপতি মুক্তার হোসেন, তাঁর ছোট ভাই একরাম হোসেন, শরীফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন, ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ডা. পারভেজ, ইউপি সদস্য বাহারসহ প্রায় ৩০ জন রাজনৈতিক কর্মী অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে অপদস্থ করার পাশাপাশি চাপ প্রয়োগ করে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়, যা মবকারীরাই আগেই লিখে রেখেছিল।

    তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি বলে জানা যায়। ঘটনার পর ইউনুস নবী বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন কিন্তু তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যালয়ে ফিরতেও পারছেন না বলে দাবি করেন।

    অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে মুক্তার হোসেন বলেন, তিনি বা তাঁর কেউ প্রধান শিক্ষককে বের করে দেননি। তাঁর দাবি, স্থানীয় লোকজন দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে দেয়। পরে ওই শিক্ষক আদালতের আশ্রয় নিলেও এখন তিনি নিজেই মামলা তুলে নিয়েছেন বলে দাবি করেন মুক্তার হোসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।

    এ বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কায়েসের রহমান বলেন, তিনি এ ঘটনার বিষয়ে অবগত নন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক নীরবতা এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

    এক উপজেলায় চার শিক্ষকের ওপর মব-সহিংসতা:

    চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত চারজন শিক্ষক মব-সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এসব ঘটনায় একদিকে যেমন শিক্ষকদের পেশাগত জীবন অচল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে তৈরি হয় দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।

    প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভাটিয়ারী হাজী তোবারক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের কান্তি লাল আচার্য্য পরে নিজ পদে ফিরে আসতে সক্ষম হন। তবে একই উপজেলার মাদামবিবিরহাট শাহজাহান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ বি এম গোলাম নূর এবং টেরিয়াইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন চক্রবর্তী এখনো স্বাভাবিকভাবে কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। আরেক শিক্ষক, সীতাকুণ্ড বালিকা বিদ্যালয়ের হিমেল শর্মা রানা ঘটনার পর থেকে আর কর্মস্থলে ফিরে যাননি। তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

    অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট এ বি এম গোলাম নূরের ওপর চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগ করানোর চেষ্টা করা হয়। তিনি এতে রাজি না হলে তাঁকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে জেলা শিক্ষা অফিস তাঁর যোগদানের বিষয়ে সহযোগিতার নির্দেশ দিলেও স্থানীয়ভাবে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। বরং যোগ দিতে গেলে তাঁকে অপমান করে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও ঘটে।

    অন্যদিকে রতন চক্রবর্তীর পরিস্থিতি আরও জটিল। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর শতাধিক মানুষের একটি দল তাঁকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর পুনর্বহাল ও বেতন চালুর নির্দেশ দিলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি বলে জানা যায়।

    এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে, বাকি বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। রতন চক্রবর্তীর ঘটনাকে তিনি আগের প্রশাসনিক বিরোধের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দাবি, এই ঘটনাগুলো শুধুই প্রশাসনিক বিরোধ নয়; বরং মব-সহিংসতার কারণে তাঁদের পেশাগত জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

    ভিকারুননিসায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মব সৃষ্টি:

    রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট এক বিতর্কিত ঘটনায় অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী এবং সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা ওই সময়ের একাধিক ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে একটি চাপ সৃষ্টিকারী পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে মবের নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিষ্ঠানেরই কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষক।

    অভিযোগ অনুযায়ী, নেতৃত্বে ছিলেন ভিকারুননিসার সাবেক শিক্ষার্থী ইফফাত গিয়াস আরেফিন এবং তিথি। তারা দুজনই ১৯৯৪ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঘটনাস্থলে কয়েকজন বহিরাগত এবং সাবেক শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিলেন, যাদের পূর্ণ পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভিডিও ফুটেজে একাধিকবার শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস শিলার উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। একই ফুটেজে শিক্ষক মাজেদা বেগমকেও দেখা যায়, যিনি বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।

    অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী অভিযোগ করেন, তাঁকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার প্রমাণ সিসিটিভি ফুটেজে রয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন এবং দেড় বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অন্তত দেড় শতাধিক আবেদন করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের তদন্তে ঘটনাটি ‘জোরপূর্বক পদত্যাগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে পুনর্বহালের নির্দেশও এসেছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এখনো বিদ্যালয় থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে দুই বছর ধরে তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

    সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম বলেন, তিনি গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার কারণে তাঁকে টার্গেট করা হয়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইফফাত গিয়াস আরেফিন প্রতিষ্ঠানটির লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এতে ভেটো দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিরুদ্ধে চাপ তৈরি হয়। তিনি আরও জানান, মবের পর প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে নানা বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হয়েছে এবং প্রাক্তনদের উদ্যোগে স্কুল প্রাঙ্গণে মেলা আয়োজনের ঘটনাও ঘটেছে।

    ফারহানা খানম অভিযোগ করেন, মবের পেছনে কয়েকজন শিক্ষকও যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মাজেদা বেগম, যিনি পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হন, এবং শিক্ষক বদরুল আলম ও জান্নাতুল ফেরদৌস শিলা। তিনি আরও বলেন, তাঁদের পুনর্বহালের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা না থাকলেও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না।

    তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তাঁদের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। তাঁর ছেলে স্কুলে আসতে চাইলে তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তিনি বের হতে সক্ষম হন। ঘটনার পর তাঁর পরিবারের ওপরও সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

    বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে মন্ত্রণালয়ের পুনর্বহাল সংক্রান্ত চিঠি নিয়ে স্পষ্টীকরণের জন্য কর্তৃপক্ষ আবারও যোগাযোগ করেছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত কমিটি নেবে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ইফফাত গিয়াস আরেফিন এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।

    তবে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন আরেক অ্যালামনাই ডা. নওশীন শারমিন পূরবী। তিনি বলেন, শিক্ষকদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা দুঃখজনক। তাঁর মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমেই হওয়া উচিত, মবের মাধ্যমে নয়।

    এদিকে অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, তিনি এখন অবসর গ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। আগামী ৩০ জুলাই তাঁর অবসর। তিনি দাবি করেন, এখনো তাঁকে পুনর্বহালের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাজে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি প্রতি মাসে স্কুলে গেলেও তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। শেষ সময়ে তিনি সম্মান ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান।

    শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষকে পদ থেকে অপসারণ:

    ২০২৩ সালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজ শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয়। একই বছর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের স্বীকৃতিও পান। তবে সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরই ওই অধ্যক্ষকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

    অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। তাঁর দাবি, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ছিল ক্লাসরুমে শৃঙ্খলা জোরদার করা, শিক্ষার্থীদের কোচিং নিরুৎসাহিত করা, নিম্নমানের পাঠ্যবই বাদ দেওয়া এবং বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত ব্যয় ও সম্মানী গ্রহণ বন্ধ করা।

    তাঁর অভিযোগ, এসব পরিবর্তনের কারণে কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ওই শিক্ষকদের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের তাঁর বিরুদ্ধে উসকে দেয়। এ সময় তিনি সিনিয়র শিক্ষক সাজ্জাদ হোসাইন, সাইফুল ইসলাম খান, ফজলুল হক খান এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলমগীরের নাম উল্লেখ করেন।

    অধ্যক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫ আগস্ট গভর্নিং বডির সভাপতি আসাদুজ্জামান খান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার স্বামী, তাঁর পাঠানো লোকজন তাকে চাপ দিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করায়। পরে তিনি আদালতের মাধ্যমে স্বপদে বহালের রায় পেলেও এখনো বিদ্যালয়ে ফিরতে পারেননি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই সময়ের একটি মব-ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থীও জড়িত ছিল। তাদের মধ্যে টিটো হোসেন, ইসরাফিল আহমেদ, নাজমুল হাসান, মৃদুল, জান্নাতি আক্তার ও পারমিতা নাম উঠে আসে।

    টিটো হোসেন বলেন, ঘটনার কারণে তাঁর জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং তিনি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চান না। মৃদুল নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষকদের ভুল বোঝানো ও উসকানির কারণে তাঁরা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে ভুল বুঝতে পেরেছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।

    একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসরাফিল আহমেদ বলেন, শিক্ষকদের প্ররোচনায় তাঁরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। পরে প্রতিবাদ করায় তাঁকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

    প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি ড. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান সেলিম বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী শিক্ষক ও বহিরাগতদের প্ররোচনায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মব সৃষ্টি করা হয়। তাঁর দাবি, এ ঘটনার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে অধ্যক্ষকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, আগের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল এবং তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে জোর করা হয়নি।

    তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কমিটি না থাকায় মন্ত্রণালয় বা উপজেলা প্রশাসন যদি আগের অধ্যক্ষকে যোগদানের নির্দেশ দেয়, তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা প্রতিহত করবে না। এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষক রাজনীতি এবং শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

    মবের সঙ্গে প্রাণহানির শঙ্কাও দেখা দেয়:

    বরিশালের গৌরনদী উপজেলার শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কণিকা মুখার্জী মব-সহিংসতার শিকার হয়ে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে ধারাবাহিক ভয়, চাপ এবং শেষ পর্যন্ত জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা।

    কণিকা মুখার্জী  জানান, ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিনি বায়োলজি ক্লাস নিচ্ছিলেন। তখন দশম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী ও এলাকার কিছু লোকের নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন স্কুলে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে দেয়। এরপর তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে পদত্যাগ করতে চাপ দেওয়া হয়। ওই দিন স্থানীয় একজনের সহায়তায় তিনি স্কুল ত্যাগ করেন। পরবর্তী কয়েক দিনে একাধিকবার স্কুলে গেলে আবারও একই ধরনের মব পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে তিনি দাবি করেন।

    তিনি আরও বলেন, ৯ সেপ্টেম্বর রাতের দিকে তাঁর বাড়িতে হুমকি দেওয়া হয়। জানালার বাইরে থেকে বলা হয়, পরদিনই পদত্যাগ না করলে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হবে। পরে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। ১৬ সেপ্টেম্বর ফিরে এলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে পদত্যাগপত্র তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।

    কণিকার ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে তিন মাস ছুটিতে থাকার পর ১ ডিসেম্বর তিনি স্কুলে ফিরে গেলে আবারও বাধার মুখে পড়েন। তিনি অভিযোগ করেন, সে সময় তাঁকে শারীরিকভাবে টানাহেঁচড়া করা হয় এবং জোর করে নতুন করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তবে সেটিও প্রশাসন গ্রহণ করেনি। এরপর থেকে তিনি বেতন বন্ধ এবং স্কুলে প্রবেশে বাধার মুখে রয়েছেন বলে দাবি করেন।

    অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মব পরিস্থিতিতে সক্রিয় ছিলেন। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর গোমস্থা, নয়ন মৃধা, নুরুল ইসলাম মেম্বার, সুমন শরীফ ও নুরুল আমিনের নাম উঠে আসে। তাদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইব্রাহীমের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

    কণিকা মুখার্জী জানান, তিনি ২০২৩ সালের আগে পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় থেকেই মূলত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, একটি পক্ষ বিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

    অন্যদিকে মবের সময় শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়। দশম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী—তিসা, শিফাত, সিয়াম ও নুরনীর নেতৃত্বে আন্দোলনের কথা জানা যায়। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় যুক্ত সুমন শরীফ  বলেন, ৫ আগস্টের পর শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে শিক্ষক কণিকা মুখার্জীর একটি মন্তব্য ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হলেও একপর্যায়ে আন্দোলনে জড়াতে হয় বলে তিনি দাবি করেন।

    বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. ইব্রাহীম বলেন, কণিকা মুখার্জী ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেছেন বলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তবে সেই পদত্যাগপত্রের অনুলিপি বা প্রমাণ দেখাতে পারেননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেলেও এখনো পুরো ঘটনার স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দ্বন্দ্ব, চাপ ও অনিশ্চয়তা এখনো বহাল রয়েছে।

    জামা-ওড়না ধরে টানাটানি ও হেনস্তা:

    রাজধানীর উত্তর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তারকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

    ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঢুকে প্রধান শিক্ষকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ভিডিওতে তাঁর দুই হাত ধরে টানাটানি করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। কেউ ওড়না ও জামা ধরে টানছে, কেউ আবার অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলছে। পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তার। একপর্যায়ে তাঁর হাতে কলম ধরিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

    শাম্মী আক্তার  বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর যোগদানের বয়স ছিল মাত্র এক বছর। শুরুতে সবাইকে ভালোভাবে চিনতেন না। তাঁর দাবি, সরকারি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবি ঘিরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর বাড়ির সামনে মব হয়। পরে ১৮ আগস্ট স্কুলে গেলে সেখানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর তিন মাস ছুটিতে থাকার পর ২৯ ডিসেম্বর আবার স্কুলে গেলে তাঁকে পুনরায় পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

    তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে স্কুলে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়ে টাকা-পয়সা দাবি করেছিলেন। তবে তিনি এতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে তাঁর দাবি। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ঘটনার পেছনে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ একটি অংশের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সহকারী প্রধান শিক্ষক শামসুল আলমকে কেন্দ্র করে বিষয়টি ঘনীভূত হয় বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রধান শিক্ষক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।

    এছাড়া স্কুলের শিক্ষক নজরুল ইসলাম, মাজেদা আক্তার, নুসরাত ফারিয়া ও সাজেদা খানমের বিরুদ্ধেও শাম্মী আক্তারকে পদত্যাগে চাপ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে শিক্ষক রাজনীতি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

    আরো বিস্তৃত মব-তৎপরতা:

    মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে মাস্টার আব্দুর রহমান একাডেমির প্রধান শিক্ষক শিবেন্দ্র চক্রবর্তী মব-সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সহকারী প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বহিরাগতরা বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের উসকে দেয়। এরপর তাঁকে ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হয়।

    শিবেন্দ্র চক্রবর্তীর দাবি, ছুটি শেষে পুনরায় বিদ্যালয়ে গেলে তাঁকে অপমান করা হয় এবং জীবননাশের হুমকিও দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও তদন্তে তা প্রমাণিত হয়নি বলে জানা যায়। এরপরও তিনি বিদ্যালয়ে ফিরতে পারেননি এবং তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ রয়েছে।

    মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে বিঞ্চুপুর জিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট অফিসকক্ষে ঢুকে স্থানীয় ও বহিরাগতদের একটি দল তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করায়। পরে তাঁকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। তাঁর বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

    রাজধানীর বাড্ডার আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে একই বছরের ৮ আগস্ট ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আয়শা আক্তারকে কক্ষে আটকে রেখে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে রাস্তায় অশালীন আচরণ ও হেনস্তার মুখে পড়তে হয় বলে জানা যায়।

    চট্টগ্রামের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক যোগ দিতে গেলে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের কক্ষে বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেন।

    কোম্পানীগঞ্জের মানিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিন স্থানীয় চাপ ও হামলার আশঙ্কায় সন্তানকে নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন বলে জানা যায়। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৮ মে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম আনোয়ারা বেগমকে শিক্ষার্থীরা ঘিরে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে, পরে তাঁকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

    নরসিংদীর পলাশে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট মব সৃষ্টি করে প্রধান শিক্ষক বরুণ চন্দ্র দাসকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলে পুনর্বহাল হন।

    একই সময় ও পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এমন একাধিক ঘটনার অভিযোগ উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা সিটি কলেজ, মিরপুর কলেজ, ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুরের গোলাম নবী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ধানমণ্ডির বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কুমিল্লার দিদার মডেল হাই স্কুল, ঢাকার আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জের দড়গ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় এবং বনানী মডেল স্কুল।

    এসব ঘটনায় শিক্ষকরা পদত্যাগে বাধ্য হওয়া, শারীরিক লাঞ্ছনা, প্রশাসনিক চাপ এবং বেতন বন্ধের মতো পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সূত্র: কালের কন্ঠ

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    অর্থনীতি

    সংকটের আগুনে ঘি ঢালছে কারা?

    এপ্রিল 22, 2026
    অপরাধ

    আইনজীবী সেজে ভয়ঙ্কর প্রতারণা, কঠোর শাস্তি দাবি আইনজীবীদের

    এপ্রিল 22, 2026
    অর্থনীতি

    নেক্সট জেন প্রকল্প—শিক্ষার মানোন্নয়ন নাকি অর্থের অপচয়?

    এপ্রিল 22, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ক্রেতারা ভারত-চীন ছাড়ছে, বাংলাদেশ পাচ্ছে অর্ডার

    অর্থনীতি আগস্ট 15, 2025

    সব ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপী নয়

    মতামত জানুয়ারি 13, 2025

    বরিশালের উন্নয়ন বঞ্চনা: শিল্প, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে নেই অগ্রগতি

    মতামত এপ্রিল 22, 2025

    টেকসই বিনিয়োগে শীর্ষে থাকতে চায় পূবালী ব্যাংক

    অর্থনীতি আগস্ট 15, 2025
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsAppp

    01339-517418

    Copyright © 2025 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.