শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা আবারও রাজধানীতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদেশে অবস্থান করেও তারা দেশের ভেতরের অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে ফোন করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেশে অবস্থানরত তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা সরাসরি ফোন ধরিয়ে দেন, পরিচয় করিয়ে দেন ‘বড় ভাই’ হিসেবে। এরপর শুরু হয় হুমকি–ধমকি। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে চাঁদা পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজি না হলে কঠোর পরিণতির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, বলা হচ্ছে—চাঁদা না দিলে জীবন দিতে হবে, যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। এ ধরনের ভয়ভীতির কারণে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেকে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কারও কাছে অভিযোগ করার সাহস পাচ্ছেন না।
শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ের চাঁদাবাজিই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে বাজার ও ফুটপাত থেকেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় এ চাঁদাবাজির অঙ্ক দৈনিক লাখ লাখ টাকায় পৌঁছায়। পাশাপাশি বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থের বিনিময়ে বাড়ি দখলের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কিছু সন্ত্রাসী শিগগিরই দেশে ফিরতে পারে—এমন প্রচারণাও চালানো হচ্ছে তাদের ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে। এতে চাঁদাবাজির মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে রাজধানীর প্রায় ২০টি এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অর্ধশতাধিক সহযোগী সক্রিয়ভাবে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদার দাবিতে গোলাগুলি এবং বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত সোমবার বিকেলে ক্যানসার হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বাধীন চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অনুসারীরা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, যার মধ্যে মাঝেমধ্যে প্রাণঘাতী ঘটনাও ঘটছে।
এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো দফায় দফায় বৈঠক করছে। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া সন্ত্রাসীদের একটি অংশ দেশের বাইরে চলে যায়। তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছে, আবার অনেকে ফেরার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি কারাগারে অবস্থান করেও কিছু সন্ত্রাসী দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির নির্দেশনা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে সরকারের তালিকাভুক্ত অন্তত ছয়জন রয়েছে।
এদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম উল্লেখযোগ্য। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের অনুসারীদের মধ্যে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালের নাম উঠে এসেছে। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ ও এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকায় ইমনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পিচ্চি হেলাল সক্রিয় রয়েছে।
এলিফ্যান্ট রোডের বিপণিবিতান মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় ইমনের অনুসারীরা জড়িত ছিল বলে জানা গেছে। জামিনে মুক্তির পর ইমন থাইল্যান্ডে চলে গেলেও তার কর্মকাণ্ড থেমে নেই বলেও সূত্র জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একটি তালিকা প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন, কেউ কারাগারে আছেন। বাকি অনেকে বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করে দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত ২৫ বছরে দেশে একাধিক আলোচিত সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটলেও বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা করে পুরস্কার ঘোষণার কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানা গেছে। তবে রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক ও কাফরুলসহ কয়েকটি এলাকায় অন্তত চারজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সক্রিয় তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত হোসেন ওরফে সাধু, কিলার আব্বাস এবং ইব্রাহিম খলিল ওরফে কিলার ইব্রাহিম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব সন্ত্রাসী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করলেও মাঝেমধ্যে মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তাদের হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে। মামুনের বিরুদ্ধে অন্তত ২৭টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আব্বাসের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বিদেশে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে গত ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় কাফরুলের একেএম অ্যাপারেলস নামে একটি গার্মেন্ট কারখানায় ১২ থেকে ১৩ জনের একটি দল প্রবেশ করে। তারা প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে তারা পিস্তল বের করে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং অফিসে ভাঙচুর চালায়। পরে লকার ও সিসি ক্যামেরার ডিভিআর ও হার্ডডিস্ক নিয়ে যায়। তিন দিনের মধ্যে চাঁদা না দিলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের বরাতে র্যাব-৪ এর মিডিয়া অফিসার কেএন রায় নিয়তি জানান, তারা ‘ফোর স্টার’ নামে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য।
এছাড়া চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীতে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীদের গুলিতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির নিহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির মাত্র ১২ দিনের মধ্যে তিনি দুবাই হয়ে সুইডেনে চলে যান। বর্তমানে সেখান থেকেই ঢাকার বিভিন্ন অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্রসহ মোট ২২টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ৯টি হত্যা মামলা এবং একটি অস্ত্র মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ডও রয়েছে। যদিও সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা বিচারাধীন আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, তিনি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন তথ্যও ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের তথ্য ও হুমকির কারণে রাজধানীর ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড, কাওরানবাজার, তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাতিরঝিল ও শিল্পাঞ্চল এলাকায় জনমনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
যে এলাকায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা :
ফার্মগেট–কাওরানবাজারসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী চক্রের সক্রিয় উপস্থিতি আবারও জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা একাধিক সহযোগী নিয়মিতভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে।
ফার্মগেট ও কাওরানবাজার অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়ানো এসব সহযোগীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক, রবিন, মাসুদ, আরিফসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে বাদশা ও আহাদ মিরপুরের শাহআলী এলাকায় অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে খামারবাড়ি এলাকায় সক্রিয় রয়েছে সিদ্দিক, রবিন, মাসুদ, আরিফ, ইকবাল ও রুবেলসহ একটি দল।
অভিযোগ রয়েছে, এসব চক্র ওয়াসা ভবন, তিতাস ভবন, কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি উন্নয়ন অধিদপ্তর (সেচভবন) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এতে টেন্ডার বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সূত্র বলছে, পূর্বে কাওরানবাজার এলাকায় এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারী চাঁদাবাজদের তৎপরতা কিছুটা কমে এলেও সম্প্রতি আবারও তাদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাওরানবাজারের আড়ত, দোকান এবং সবজিবাহী ট্রাক থেকে নিয়মিতভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি গ্রীন রোড ও ইন্দিরা রোডের অবৈধ লেগুনা স্ট্যান্ড থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া মাদক ব্যবসা, কন্ট্রাক্ট কিলিং, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এসব সহযোগী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি কিশোর ও তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে দলে টেনে নেওয়ার মাধ্যমে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায়ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন সহযোগী সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে ইব্রাহিম, মুন্না, কিলার বাদল, কিলার জসিম, সোহেল আকন ওরফে তেল সোহেল, মোজাম্মেল, শরীফ, রুবেল, লেদু হাসান, মামুন, কালু ওরফে কিলার কাল্লু, সানি ওরফে তপন সানি, মিলন ওরফে ডাক্তার মিলন, সুমন ওরফে কাইল্যা সুমন, আফজাল ওরফে নেট আফজাল, সাইফুল ওরফে পিচ্চি সাইফুল, ভিল্লু পারভেজ, হারুন ওরফে ভাগিনা হারুন, নজরুল ওরফে হাড্ডি খোকন, আরমান, আসাদুল ওরফে লম্বু আসাদুল, শাহরুখ, আল আমিন, নবী ও আব্দুল্লাহসহ আরও অনেকে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিলার জসিম দীর্ঘ ১৮ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি একসময় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন বলেও জানা গেছে। বর্তমানে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে লেদু হাসান কাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত নভেম্বর মাসে রাজধানীর পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দুটি গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিনের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব আবারও সামনে আসে। নিহত তারিক সাইফ মামুন রাজধানীর তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন ছিলেন। একসময় তিনি ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের নামও উঠে এসেছে। জানা যায়, ১৯৯৭ সালে মোহাম্মদপুরে জোসেফের ভাই টিপু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামুন অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন। সেই ঘটনার জের ধরেই দীর্ঘদিন ধরে জোসেফের টার্গেটে ছিলেন মামুন।
দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, রাজধানীর অন্যান্য এলাকার তুলনায় মোহাম্মদপুরে হত্যাকাণ্ডসহ অপরাধের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটছে। গত ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হক নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর দুই দিন আগে ১২ এপ্রিল বিকেলে রায়ের বাজার এলাকায় ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন নামের এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শুধু মোহাম্মদপুরই নয়, নগরজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় তাদের নির্দেশে কিলার গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে রাজধানীতে অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকায় মোট ১০৭টি হত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সারা দেশে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যার ঘটনা ঘটে। চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ধর্মসিং চাকমার নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ওই ঘটনায় ভাগ্যশোভা চাকমা ও কৃপাসোনা চাকমা নামে দুই নারী গুরুতর আহত হন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচ এম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি আরও জানান, জামিনে থাকা সন্ত্রাসীদের বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে এবং সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর অপরাধ জগতে নামগুলো হয়তো নতুন নয়, কিন্তু আতঙ্কের ছায়া যেন দিন দিন আরও গাঢ় হচ্ছে। বিদেশে বসে নির্দেশ, দেশে বাস্তবায়ন—এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে। তালিকা, অভিযান, বৈঠক—সবই চলছে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
নগরীর অলিগলি, বাজার, টেন্ডার আর ফুটপাত—সবখানেই যেন এক অদৃশ্য চাপা ভয়। আর সেই ভয়ের কেন্দ্রে রয়ে গেছে একই প্রশ্ন—এই চক্র কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, নাকি এবার সত্যিই ভাঙার পথে তাদের নেটওয়ার্ক?
সময়ই দেবে সেই উত্তর।
সূত্র: যুগান্তর