জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর নাম রুমানা আক্তার। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে “এডভোকেট” হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ফেসবুকে (ID: Liza Jannat) এবং টিকটকে (ID: Advocate liza jannat vai amr jan) বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আইনজীবী মহলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিনি নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন, যা নিয়ে পেশাজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাঁদের মতে, এ ধরনের পরিচয় আইনজীবী সমাজের মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কোর্ট প্রাঙ্গণে উপস্থিত আইনজীবীরা তাঁকে শনাক্ত করেন। এরপর উপস্থিতদের সামনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে কিছু স্বীকারোক্তি দেন। তবে পরবর্তীতে তাঁর বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে তাঁকে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে তাঁর বিষয়ে অতীতেও প্রতারণাসংক্রান্ত অভিযোগ থাকার কথা উঠে আসে বলে জানা যায়। এসব তথ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে এবং সমিতির মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে তাঁকে ‘টাউট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

তবে মানবিক দিক বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। শর্তগুলোর মধ্যে ছিল—সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাকটিভ করা, বিভ্রান্তিকর ভিডিও অপসারণ এবং কোর্ট প্রাঙ্গণে অনধিকার প্রবেশ না করা। এ বিষয়ে তিনি লিখিত বন্ডও দেন। তবে আইনজীবী মহলের একাংশের অভিযোগ, মুক্তির পরও তিনি ওই শর্তগুলো পুরোপুরি মানেননি এবং আবারও একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
আইনজীবী পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র নিয়মিতভাবে আইনজীবী সেজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এরা প্রকৃতপক্ষে আইনজীবী নন বলেও দাবি উঠছে। আদালত প্রাঙ্গণসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ব্যক্তি ধরা পড়লেও, কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী মহলে ক্ষোভ বাড়ছে।
আইনজীবীদের একাংশ মনে করেন, এভাবে ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো আইন পেশার মর্যাদার ওপর আঘাত। আইন পেশা একটি সম্মানজনক দায়িত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে ভুয়া পরিচয়ের ব্যবহার জনআস্থাকে দুর্বল করছে এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
বার কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন ছিল। নিয়মিত অভিযোগ ও শনাক্তকরণের পরও দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, শাস্তির অভাবই কি এসব প্রতারণাকে আরও উৎসাহিত করছে?
আদালত সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় এসেছে যে, দ্রুত ও কার্যকর নজরদারি না বাড়ালে ভবিষ্যতে ভুয়া আইনজীবীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এতে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতারণা নয়, পুরো বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে। আইনজীবীদের দাবি, এখনই কঠোর যাচাই-বাছাই, দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত না করলে আইন পেশার পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ভুয়া আইনজীবী ও প্রতারণামূলক পরিচয় দমন করতে শুধু অভিযোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর ব্যবস্থা। আইনজীবী মহল ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতে, এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে হবে। আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতে হলে বার কাউন্সিলের বৈধ সনদ যাচাই বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। শুধু পরিচয়পত্র দেখানো নয়, ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হলে ভুয়া পরিচয় শনাক্ত সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, বার কাউন্সিলের ডাটাবেস নিয়মিত হালনাগাদ এবং তা আদালত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। এতে করে মুহূর্তেই কোনো ব্যক্তির আইনজীবী হওয়ার বৈধতা যাচাই করা সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, ভুয়া পরিচয়ে ধরা পড়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সতর্ক করে ছেড়ে দিলে এই প্রবণতা থামানো কঠিন হয়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, আইনজীবী সমিতিগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত যাচাই, সদস্য তালিকা প্রকাশ এবং জনসচেতনতা তৈরি করা হলে সাধারণ মানুষও প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।
এখন প্রশ্ন হলো—আইন পেশার মতো একটি সর্বোচ্চ আস্থার জায়গায় যদি বারবার ভুয়া পরিচয়ের মানুষ ঢুকে পড়তে পারে, তবে আসল সুরক্ষা কোথায়? ধরা পড়ছে, অভিযোগ উঠছে, আলোচনা হচ্ছে—কিন্তু এরপরও কেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি? কেন প্রতিবারই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায় না?
যে আদালত সত্য ও ন্যায়ের শেষ আশ্রয়স্থল, সেখানে যদি পরিচয়ের সত্যতা নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়, তবে সাধারণ মানুষের ভরসার ভিত্তি কতটা স্থির থাকে? এটা কি শুধু কয়েকজন ভুয়া পরিচয়ধারীর গল্প, নাকি পুরো ব্যবস্থার ভেতরে থাকা ফাঁকফোকরেরই প্রতিচ্ছবি?

