২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আদালতের আদেশে প্রায় ৩০ হাজার ৩৫১ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও স্থগিত করেছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংস্থাটির তথ্যমতে, সারা বছর জুড়ে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার ৫২৯ কোটি টাকার সম্পদ এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।
দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট জানায়, মোট ৩৭০টি আদালতের আদেশের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এর মধ্যে দেশে স্থাবর সম্পদ জব্দের জন্য ২২১টি আদেশ পাওয়া যায়। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৯৭৯ একর জমি, ৯১টি বাড়ি, ৫৯টি ভবন, ১৯২টি ফ্ল্যাট, ৬০টি প্লট, ৪৫০টি যানবাহন, ১৪টি বাণিজ্যিক স্থাপনা, ১০টি দোকান, দুটি মার্কেট, দুটি জাহাজ এবং একটি শটগান। এসবের মোট মূল্য প্রায় ৬ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বেশি। বিদেশেও কিছু সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি ফ্ল্যাট, আটটি যানবাহন ও দুটি বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৯৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, অস্থাবর সম্পদ স্থগিতের ক্ষেত্রে ২৫৬টি আদালতের আদেশে দেশে প্রায় ২৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ করা হয় এবং বিদেশে আরও প্রায় ৯৪৪ কোটি টাকার সম্পদ স্থগিত করা হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে ৬ হাজার ৮৪৭টি ব্যাংক হিসাব, ১০৭টি সঞ্চয়পত্র, ৪২১টি প্রতিষ্ঠানে ৬০ কোটির বেশি শেয়ার, ৪০টি স্থায়ী আমানত, পাঁচটি লকার, ৩২১টি পে-অর্ডার, বিভিন্ন বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ।
তুলনামূলকভাবে, ২০২৪ সালে জব্দ ও স্থগিত সম্পদের পরিমাণ ছিল অনেক কম। সে সময় দেশে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ এবং প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ স্থগিত করা হয়। বিদেশে কিছু ফ্ল্যাট, প্লট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের পাশাপাশি প্রায় ২ লাখ ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল।
তদন্ত কার্যক্রমের দিক থেকেও ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। আগের বছরের ৭১৭টি মুলতবি অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন করে ৪০০টি যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০৯। এর মধ্যে ১৬৩টি অনুসন্ধান সম্পন্ন হয়েছে, ৪৪৯টি মামলা হিসেবে রূপ নিয়েছে এবং ৪৭টি বন্ধ করা হয়েছে।
মানি লন্ডারিং সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানে নতুন ২৯টি যুক্ত হয়ে মোট ৭৩টি চলমান রয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি সম্পন্ন হয়েছে। সম্পদ-সংক্রান্ত অনুসন্ধানে নতুন ২১৯টি যোগ হয়ে মোট ৩৭৭টির মধ্যে ৬০টি শেষ হয়েছে এবং ১৩৭টি মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে।
তদন্ত পর্যায়ে মোট ৪৪৯টি মামলা চলমান রয়েছে। মোট ৭৯৪টি তদন্ত কার্যক্রমের মধ্যে ১২৯টি সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪টিতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং ২১টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সম্পদ-সংক্রান্ত তদন্তে ৪৬৮টি মামলা চলমান, যার মধ্যে ৭০টি শেষ হয়েছে এবং ৫৪টিতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিং মামলায় ১৮৯টির মধ্যে পাঁচটি সম্পন্ন হয়েছে এবং পাঁচটিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, অনুসন্ধান ও তদন্তের সময় যেসব সম্পদ অবৈধ বলে সন্দেহ হয়, সেগুলোর বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করা হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়। বিদেশে থাকা সম্পদ দেশে ফেরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।

