চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত ১৬৩টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি মামলায় অভিযোগ অপ্রমাণিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার এসবের মধ্যেই ১৪টি মামলাকে সরাসরি ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পিবিআই সূত্র বলছে, এসব মামলার তদন্তে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। অনেক এজাহারে ঘটনার বর্ণনায় অসামঞ্জস্য ছিল। কোথাও সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে আসামির পরিচয়ের মিল পাওয়া যায়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাদীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি কিংবা বাদী নিজেই মামলা পরিচালনায় অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। এমন নানা কারণ বিবেচনায় নিয়েই কয়েকটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ অপ্রমাণিত বলে মত দিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
পিবিআই সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে হওয়া মামলাগুলোর একটি বড় অংশ তদন্ত করছে পিবিআই। মোট ২৭২টি মামলার তদন্তভার সংস্থাটির হাতে আসে। এর মধ্যে ১৯৫টি সিআর (কমপ্লেইন রেজিস্টার) মামলা এবং ৭৭টি জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা।
এ পর্যন্ত জমা দেওয়া ১৬৩টি তদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যে ১০৩টি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সিআর মামলা ৮৪টি এবং জিআর মামলা ১৯টি। অন্যদিকে ৬০টি মামলায় অভিযোগ অপ্রমাণিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিআর মামলা ৫০টি ও জিআর মামলা ১০টি। অপ্রমাণিত মামলার মধ্যেই ১৪টিকে ‘মিথ্যা মামলা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে সিআর মামলা ২টি এবং জিআর মামলা ১২টি।
তদন্ত অগ্রগতির হিসাব অনুযায়ী, জিআর মামলার ৭৭টির মধ্যে ৩৭টির তদন্ত শেষ হয়েছে। বাকি ৪০টি এখনও তদন্তাধীন। অন্যদিকে সিআর মামলার ১৯৫টির মধ্যে ১৩৪টির তদন্ত শেষ হয়েছে এবং ৬১টির তদন্ত চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে ‘অপ্রমাণিত’ শব্দটি সাধারণত ফাইনাল রিপোর্ট বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। এই ফাইনাল রিপোর্ট আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে—‘সত্য’ ও ‘মিথ্যা’। ‘সত্য’ ফাইনাল রিপোর্টে সাধারণত ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অভিযোগে উল্লেখিত আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর ‘মিথ্যা’ ফাইনাল রিপোর্টে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, অভিযোগ বা বর্ণনাকেই অসত্য বা অসংলগ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পিবিআই সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, সংস্থাটির হাতে থাকা অধিকাংশ মামলার তদন্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তার ভাষ্য, অনিষ্পন্ন মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, পিবিআই দীর্ঘদিন ধরে জটিল ও ক্লুলেস মামলার তদন্তে কাজ করছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। সে কারণে জুলাই অভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে এসব হত্যা মামলার তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত সহিংসতায় নিহতদের অনেকের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়নি। ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় ময়নাতদন্ত সাধারণত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বিভিন্ন কারণে কিছু মরদেহের ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব মামলায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নেই, সেখানে বিকল্প সাক্ষ্য ও তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লাশ গোসল করানো ব্যক্তি, জানাজায় অংশ নেওয়া ইমাম এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মরদেহের ছবি, ঘটনার ভিডিও এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া মৃত্যুসনদও তদন্তে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, সাধারণ হত্যা মামলায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তা ছাড়া বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, যদি মরদেহ গুম, পুড়িয়ে ফেলা বা সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, অথবা আসামি নিজেই হত্যার দায় স্বীকার করে, তাহলে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেও বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৩০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৩১টি। এসব মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), পিবিআই, সিআইডি এবং বিভিন্ন জেলা পুলিশ। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে ৭১৫টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৪৬টি হত্যা মামলা।

