নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ নদী মেঘনার বড় একটি অংশ দখল করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় তিন দশক ধরে ধীরে ধীরে এই দখল প্রক্রিয়া বিস্তৃত হয়েছে। নদীর শাখা খালগুলো দখল করে সেখানে একাধিক শিল্পকারখানাও স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, সোনারগাঁও এলাকার মেঘনা নদীর তীরবর্তী অংশে এক সময়ের কৃষিজমি ও বসতভিটা ধীরে ধীরে শিল্পাঞ্চলে রূপ নেয়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বিস্তার মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক মহল এবং প্রশাসনের কিছু অংশের পরোক্ষ সহায়তাও ছিল।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সোনারগাঁও সংলগ্ন মেঘনা নদীর প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির দখল ও আধিপত্য বিস্তৃত। সরকারি নকশা ও নথিপত্রে থাকা নদীর অনেক অংশ এখন বাস্তবে স্থলভূমিতে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীর জায়গা ভরাট করে সেখানে স্থায়ী স্থাপনা ও শিল্পকারখানার করিডর গড়ে তোলা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে তথ্য থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দখল কার্যক্রমে বিভিন্ন সময় সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল। ফলে উচ্ছেদ অভিযান কার্যকর হয়নি এবং নদী পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও থমকে গেছে বলে দাবি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
মেঘনা গ্রুপের নিজস্ব তথ্যমতে, সোনারগাঁও এলাকায় মেঘনা নদীর তীরসংলগ্ন প্রায় ২৪৫ একর জায়গাজুড়ে ‘মেঘনা ইকোনমিক জোন’ গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেপার, টিস্যু, কেমিক্যাল, ফুড, এলপিজি, তেল, খাদ্য, প্যাকেজিং, সিমেন্ট, গার্মেন্টস ও রাসায়নিক শিল্পকারখানা। পাশাপাশি একটি পাওয়ার প্ল্যান্টও রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য সূত্রে জানা গেছে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী মেঘনা শুধু জলপথ নয়, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নদীর বিস্তীর্ণ অংশ দখল ও শিল্পায়নের কারণে এর স্বাভাবিক গতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না—এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
১৯৮৯ সালে শুরু, ধাপে ধাপে বিস্তার মেঘনা গ্রুপের শিল্পজাল:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনা ঘাট এলাকায় ১৯৮৯ সালে প্রথম শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। তখন ছোট পরিসরে মেঘনা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল’ কারখানা।
এরপর ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে নদীর তীরবর্তী এলাকায় একের পর এক নতুন কারখানা গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয়ভাবে এ সময়টিকে তাদের শিল্প সম্প্রসারণের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে নদীর কিছু অংশ ভরাট করে সেখানে গড়ে তোলা হয় বিস্তৃত শিল্পাঞ্চল বা শিল্প ক্লাস্টার। এতে নদীসংলগ্ন ভূমির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় বলে জানা যায়।
এরপর ২০১৬ সালে ওই এলাকাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার পর আরও দ্রুত বিস্তার ঘটে শিল্প অবকাঠামোর। এই সময়ের মধ্যে নদীর অংশ ব্যবহার করে শিল্প ও পাওয়ার প্ল্যান্ট জোন সম্প্রসারণ করা হয় বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় ৩৭ বছরের ব্যবধানে এ এলাকায় মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৫-এর বেশি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মেঘনা নদীর নকশা-জরিপ ঘিরে অনুসন্ধানের সূত্রপাত:
দেশে নদ-নদীর ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব বর্তমানে সাতটি সরকারি দপ্তরের ওপর ন্যস্ত। এসব দপ্তরের ভূমি জরিপ রেকর্ড, নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভেসহ বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণ করেই মেঘনা নদীসংলগ্ন এলাকায় একটি বড় ধরনের ভূমি পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। এই নথিগুলোতেই মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের দখল ও স্থাপনা বিস্তারের বিষয়টি শনাক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
ভূমি জরিপ রেকর্ড ও সরকারি নকশায় দেখা যায়, নদী-চর ও ফ্লাডপ্লেইন করিডরের বহু অংশ ধীরে ধীরে স্থলভূমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এসব পরিবর্তনের পেছনে দীর্ঘ সময় ধরে ভূমি ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়। মেঘনা নদীর উজানের আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুর হয়ে আনন্দ বাজার পর্যন্ত নদীর বিস্তার প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার। অন্যদিকে দুধঘাটা থেকে ঝাউচর পর্যন্ত মধ্যবর্তী অংশে নদীর সীমানা প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এই পুরো অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা ও অবকাঠামোর উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুর হয়ে ঝাউচর এবং দুধঘাটা অংশ পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীতীর ও নদীভূমিতে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। আনন্দ বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটারের বেশি জলাশয়ের ওপর এলপিজি কারখানা ও শিপইয়ার্ড স্থাপনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে ঝাউচর ও আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় আগে যেখানে প্রায় ০.৮ থেকে ১.৫ কিলোমিটার বিস্তৃত জলধারা ছিল, তা এখন সংকুচিত হয়ে ২০০ থেকে ৫০০ মিটার চ্যানেলে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইসলামপুর ও দুধঘাটা অংশে নদীর প্রস্থ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমেছে বলে নথিতে দেখা যায়। আনন্দ বাজার এলাকায় নদী এখন প্রায় ৩০০ থেকে ৮০০ মিটার চ্যানেলে সীমিত হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ ও বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভেতে দেখা যায়, ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় চর ও মৌজাগুলোর মধ্যে নদীর কার্যকর জলধারা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে ইসলামপুর এলাকায় নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.২ থেকে ১.৫ কিলোমিটার, যা ২০২৬ সালে কমে ৩০০ থেকে ৫০০ মিটারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ঝাউচর এলাকায় ১ কিলোমিটার প্রস্থ কমে ২৫০ থেকে ৪০০ মিটার হয়েছে। আষাঢ়িয়ার চর ও দুধঘাটা এলাকাতেও নদীর প্রস্থ প্রায় অর্ধেক বা তারও বেশি কমে গেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
পিরোজপুর ও ছয়হিস্যা এলাকায়ও একই ধরনের সংকোচনের চিত্র পাওয়া যায়। আনন্দ বাজার এলাকায় আগে যেখানে নদী ও চর মিলিয়ে ২ থেকে ৪ কিলোমিটার বিস্তৃত জলাধার ছিল, তা এখন কমে ১.৫ থেকে ২.৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এসব পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। খোলা পানির পরিমাণ কমে মূল চ্যানেল ছোট হয়ে এসেছে, যা নদীর স্বাভাবিক গতিপথে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকার আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজায় ১৯৮৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মেঘনা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালের চিত্রে মেঘনা নদী তুলনামূলকভাবে অনেক প্রশস্ত ছিল এবং নদীর বুকজুড়ে বিস্তৃত চর থাকলেও তীরবর্তী এলাকায় বসতি ছিল সীমিত।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সরকারি নকশা ও ভূমি রেকর্ড, বিভিন্ন নথিপত্র এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয়, উপজেলার চর বলাকি থেকে মেঘনা ঘাট হয়ে উজানের আনন্দ বাজার পর্যন্ত নদী ও তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল ও ব্যবহার পরিবর্তনের শিকার হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, নদীর তীরে মেঘনা গ্রুপ জেটি ও বার্জ লোডিং ডক, বড় বড় স্টোরেজ ট্যাংক, পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্লক, ফ্রেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এবং ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাসহ একাধিক শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এসব স্থাপনার সীমানা সরাসরি নদীর ভেতরে বিস্তৃত বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়। আনন্দ বাজার এলাকায় নদীর অংশ ভরাট করে এলপিজি ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়।
ঝাউচর–প্রতাবের চর অংশে নদীর প্রবেশমুখ ভরাট করে সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানা যায়। একই এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। এই অংশে টিস্যু ও প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানাও গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পশ্চিম প্রান্তে শাখা নদীর চর বলাকি ও আষাঢ়িয়ার চর এলাকার পূর্বাংশে ফ্রেশ সিরামিক শিল্প স্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব স্থাপনার কারণে নদীর প্রস্থ সংকুচিত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে বলা হয়।
স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হয়, নদীর সংকোচনের কারণে নিয়মিত নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এক সময় যেসব পথে নৌচলাচল ছিল, সেখানে এখন স্থাপনা ও ভরাট ভূমির কারণে স্বাভাবিক প্রবাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। আষাঢ়িয়ার চরের দক্ষিণ সীমানায় নদীর অংশ ভরাট করে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সোনারগাঁও–গজারিয়া সীমান্তে মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে সরকারি জমি ও চর দখলের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্র অনুযায়ী, এ কার্যক্রমের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং নৌ চলাচল ও পরিবেশ—উভয়ই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, এই এলাকায় নদীর তীরবর্তী কয়েকশ একর জমি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিনেছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদীর পাড়ে কান্দারগাঁ এলাকায় বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে বালু ভরাট করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এই ভরাট কার্যক্রম ধীরে ধীরে নদীর ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। মেঘনা ঘাটের ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত করিডরজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে বালু ভরাট, চর দখল ও স্থায়ী নির্মাণ কার্যক্রম চলায় নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
২০২০ সালের পর নদী ও চর এলাকার বড় অংশ স্থায়ী ভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ায় নদীর প্রাকৃতিক চ্যানেল আরও সংকুচিত হয়েছে বলে নথি ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণে উল্লেখ পাওয়া যায়। আষাঢ়িয়ার চর থেকে ঝাউচর পর্যন্ত এলাকাও এ প্রক্রিয়ার বাইরে নয় বলে দাবি স্থানীয়দের। নদী তীরবর্তী ৪৩ জন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অধিকাংশই একই ধরনের তথ্য ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন—মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ অংশ ধীরে ধীরে দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে।
দুধঘাটা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আবদুল লতিফ বলেন, এক সময় এই নদী ছিল প্রশস্ত ও প্রবল। তার ভাষায়, নদীর পাড়ে চর ও স্থানীয়দের জমি ছিল। তবে গত দেড় দশকে নদী ভরাট ও দখলের মাধ্যমে এর চরিত্র বদলে গেছে বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে আষাঢ়িয়ার চর এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ফ্রেশ কোম্পানি প্রথমে নদীর সীমানা ঘেঁষে জমি কেনার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে নদীর অংশ দখল করা হয় বলে তার অভিযোগ। তার মতে, নদীর শাখা এখন আগের তুলনায় অনেক সরু হয়ে গেছে এবং দুই পাশেই শিল্প স্থাপনা বিস্তৃত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগে কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে। তবে তাদের বক্তব্যের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদুর রহমান মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রে বলা হয়, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি নদী নয়, চর ভরাটের কাজে যুক্ত ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান অভিযোগ করেছেন, তার নিজস্ব প্রায় ৩০ বিঘা জমি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের দখলে রয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার এসব জমি দখল করা হয় এবং এখনো তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সংসদ সদস্য মান্নান আরও বলেন, “মেঘনা গ্রুপ আমার জায়গা দখল করেছে। আমার ৩০ বিঘা জমি এখনো তাদের দখলে রয়েছে।” তিনি দাবি করেন, বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ কঠিন হলেও বর্তমান সরকার জনগণের সরকার হিসেবে বিষয়টি সমাধান করতে সক্ষম হবে। তিনি জানান, নদী দখল ইস্যুটি তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং জাতীয় সংসদেও তুলে ধরবেন।
নদী থেকে খাল—সবখানেই দখলের অভিযোগ:
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শুধু নদী নয়—মেঘনা নদী থেকে সৃষ্ট শাখা খালগুলোও দখলের বাইরে থাকেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তিনটি প্রধান খালের মধ্যে হরিগঞ্জ, রামদি এবং ঝিউরতলা খাল বর্তমানে ব্যাপকভাবে সংকুচিত বা দখল হয়ে গেছে বলে নথিপত্র ও স্থানীয় তথ্যসূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
সরকারি নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা এবং ভূমি জরিপ রেকর্ড অনুযায়ী, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বসুন্দরদি এলাকায় হরিগঞ্জ খালের প্রস্থ একসময় ছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট। বর্তমানে এটি অনেক জায়গায় ৫ থেকে ৮ ফুটের সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। একইভাবে নরসুলদি এলাকার রামদি খাল, যার প্রস্থ ছিল ২০ থেকে ৩০ ফুট, সেটিও এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঝিউরতলা খাল, যা মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কুশাসন মৌজায় অবস্থিত, ১৯৯০-এর দশকে প্রায় ২০ থেকে ৪০ ফুট চওড়া ছিল বলে জানা যায়। এখন এটি সরু খালে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
হরিগঞ্জ খালের অংশে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানা এবং রামদি খালের সীমানায় শিপইয়ার্ড স্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। ঝিউরতলা খালের অংশে মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে। আনন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা মহিবুল্লাহ প্রধান বলেন, হরিগঞ্জ খালের মুখ এবং নদীর সংযোগস্থল দখল করে সেখানে শিল্প স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। তার দাবি, খাল দখলের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলেও বিভিন্ন চাপ ও হয়রানির কারণে তা কার্যকর হয়নি।
মামরতপুর গ্রামের সানাউল্লাহ ব্যাপারী বলেন, খাল ও নদীর সংযোগস্থলে শিপইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে কামারগাঁও এলাকার আব্দুর রহমান জানান, ঝিউরতলা খালের বড় অংশ ভরাট করে ইকোনমিক জোন নির্মাণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশ দিয়ে কারখানার বর্জ্য প্রবাহিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল প্রেস কাউন্সিলে দাখিল করা এক মামলায় জানান, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় তাদের প্রকল্প এলাকার আয়তন প্রায় ১.১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ০.২১ কিলোমিটার প্রশস্ত। ওই এলাকায় মোট ২১০ বিঘা জমি ক্রয় এবং ৭.৩৩ বিঘা সরকারি বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে নামজারির নথিতে তার নামে ৪৮.০২ বিঘা জমি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি শুধু একটি মৌজার চিত্র, অন্য এলাকাগুলোতে জমির হিসাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
গুগল আর্থের বিভিন্ন সময়ের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা, দুধঘাটা ও নরসুলদী মৌজা এলাকায় ১৯৮৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মেঘনা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও শিল্প অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
১৯৮৮ সালে মেঘনা নদী তুলনামূলকভাবে প্রশস্ত ছিল এবং নদীর বুকে ছিল ছোট চর। তবে পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় শিল্পায়ন ও ভরাট কার্যক্রমের মাধ্যমে নদীর বিস্তার পরিবর্তিত হয় বলে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মেঘনা গ্রুপ নদীর ১২ কিলোমিটারের বেশি অংশ ভরাট করে শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলেছে।
হোসেনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) হাবিবুর রহমান মুন্সী বলেন, আষাঢ়িয়ার চর ও চর রমজান মৌজায় মেঘনা গ্রুপ নামজারি করা জমির খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করে আসছে। তবে ‘ক’ তফসিলভুক্ত সরকারি সম্পত্তির অংশের রাজস্ব তারা প্রদান করে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। নদীর দখলকৃত অংশ থেকে কোনো রাজস্বও আসে না বলে জানান তিনি।
মোগরাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার জানান, শুধু নামজারি করা জমির রাজস্ব প্রদান করা হয়। মেঘনা ইকোনমিক জোনের রাজস্ব মওকুফ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কামারগাঁও ও কুশাসন মৌজার খালের অংশ দখল হয়ে আছে এবং সেখান থেকেও রাজস্ব আদায় হচ্ছে না বলে তিনি জানান।
স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি নদী ও খাল দখল এবং দূষণের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। সংগঠনটি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে অভিযোগপত্রও জমা দেয়।
সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হোসাইন অভিযোগ করেন, মেঘনা গ্রুপ নদীর অংশ দখল করে শিল্প স্থাপনা নির্মাণ করেছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করছে। তিনি আরও দাবি করেন, এসব বিষয়ে অভিযোগ করায় তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিবাদ বা প্রতিবেদন করলেই মামলা ও চাপের মুখে পড়তে হয়, ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, নদী ও খাল রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ের কিছু অংশ প্রভাবিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে নদী দখল ও ভরাটের কারণে মেঘনা নদী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, বর্তমান সরকারের উচিত দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
২০১৯ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি সোনারগাঁ এলাকায় অনুসন্ধান চালায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এলাকায় আনুমানিক ৩০০ থেকে ১৬০০ বিঘা নদীর জমি বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী দখল করেছে, যার মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অন্যতম।
পরবর্তীতে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পৃথকভাবে পরিচালিত কমিশনের তদন্তে বলা হয়, মেঘনা নদী ও প্লাবনভূমি অবৈধভাবে ভরাট ও দখল করা হয়েছে এবং অন্তত সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি নদীর অংশে স্থাপিত। তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় প্রশাসনকে দখলদারদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সুপারিশ করা হয় বলে জানা যায়।
মেঘনা নদী দখল ও ভরাটে আদালতের একাধিক রায়, তবুও বাস্তবায়নে ধীরগতি:
সোনারগাঁয়ের মেঘনা নদী ও আশপাশের জলাভূমি ভরাট ও দখলের অভিযোগে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর পক্ষে আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। পরে ২০১৮ সালে আদালত নতুন করে নদী ভরাট, দখল ও নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন।
২০২০ সালে হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে সোনারগাঁয়ের ছয়টি মৌজায় প্রায় ১৮৬৮ বিঘা জমি ও মেঘনা নদীর অংশ ভরাটকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ভরাট করা জমি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ওই ছয় মৌজায়—নদীর অংশ, কৃষিজমি, নিম্নভূমি ও জলাভূমিতে—নতুন করে মাটি ভরাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন এবং হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখনো তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
একাধিক রায় ও নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ভরাট ও দখল কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পরিবেশ অধিদপ্তর এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলে অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের বিরুদ্ধে দখলসংক্রান্ত নথি ও তথ্য কার্যকরভাবে ব্যবহার না করার অভিযোগও রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
গত প্রায় ৩৬ বছরে নদী ও খাল দখল ইস্যুতে মেঘনা গ্রুপ দু’বার বড় ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়েছে বলে জানা যায়। ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ মেঘনা নদী দখল করে রাখা প্রায় ৩৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে। এর আগে ২০১২ সালে আনন্দ বাজার এলাকায় প্রায় ৩০ একর নদীতীর ও জলাভূমি ভরাটের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং ভরাটকৃত অংশ নদীরূপে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে সেই নির্দেশও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর মেঘনা নদীবন্দরের উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, নদী দখল বন্ধে তদারকি চলমান রয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন নির্দেশনা পেলে উচ্ছেদ কার্যক্রম নেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহাম্মেদ জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দখল হওয়া নদী ও খাল উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে এবং অবৈধ স্থাপনা থাকলে তা অপসারণ করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক এ এইচ এম রাসেদ বলেন, দূষণ ও দখলের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসিফ আল জিনাত বলেন, নদী ও খাল সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো অভিযোগ বা নথি পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির জানান, পূর্ববর্তী প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে বর্তমান সময়ে নদী বা জমি দখলের প্রমাণ পাওয়া গেলে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
মেঘনা নদী দখল ও ভরাটের অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের আইন বিভাগের ম্যানেজার (লিগ্যাল) আশফাকুল ইসলাম দাবি করেন, তার জানা মতে বর্তমানে কোম্পানির বিরুদ্ধে নদী দখল সংক্রান্ত কোনো মামলা নেই। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো নোটিশ বা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে তা সাধারণত গণমাধ্যমের নজরে আসে। তবে নদী বা জমি দখল সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করার এখতিয়ার তার নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা কোম্পানির মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (টেকনিক্যাল) কার্তিক চন্দ্র দাস এই এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা যায়। তবে তার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এছাড়া মেঘনা ইকোনমিক জোনে অবস্থিত তার অফিসে সরাসরি গেলে সেখানে এই প্রতিবেদককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
মেঘনা গ্রুপের পরিচালক (এডমিন) তৌফিক উদ্দিন আহমেদ, যিনি এর আগে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি বলেন, “আমি মূলত প্রশাসনিক ও গাড়ি সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখি, এর বাইরে অন্যান্য বিষয় আমার দায়িত্বে নেই।” তিনি আরও বলেন, দখল বা নদী সংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না এবং এ বিষয়ে অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া যেতে পারে। সূত্র: খবরের কাগজ
সিভি/এম

