রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি ভয়ংকর অপরাধী চক্র। নারী-পুরুষ মিলিয়ে গঠিত এই চক্রটি চুরি ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অটোরিকশা সংগ্রহ করে শুধু নয়, অনেক ক্ষেত্রে চালকদের হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একেকটি অটোরিকশার মূল্য প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। এই অর্থের লোভেই সংঘবদ্ধভাবে নানা ধাপে সিনেমার কায়দায় অপরাধ সংঘটিত করে তারা।
গত দুই বছরের কম সময়ে এই চক্রের হাতে অন্তত সাতজন অটোরিকশা চালকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। হত্যার পর লাশ গুম করতে তারা ঢাকার আশপাশের নদী ও ঝোপঝাড়কে ব্যবহার করেছে। নৌ-পুলিশের তদন্ত শুরু হয় সাভারের বংশী নদী থেকে ভেসে আসা এক অজ্ঞাত মরদেহকে কেন্দ্র করে। পরে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে জানা যায়, নিহত ব্যক্তি হুমায়ুন কবির—পেশায় অটোরিকশা চালক। এই ঘটনার সূত্র ধরেই চুরি ও ছিনতাই হওয়া অটোরিকশার গন্তব্য এবং এর পেছনের চক্র নিয়ে অনুসন্ধানে নামে কালবেলা।
প্রায় এক মাসের অনুসন্ধানে অন্তত ২০ জন অটোরিকশা মালিক ও চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চুরি হওয়া রিকশাগুলো মূলত কিছু নির্দিষ্ট গ্যারেজে বিক্রি হয়। এরপর ধীরে ধীরে উঠে আসে একটি সংগঠিত চক্রের তথ্য, যারা এসব অবৈধ লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ এলাকার অন্তত পাঁচটি রিকশা গ্যারেজের মালিক এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা শুধু চোরাই রিকশা কেনাবেচাই নয়, বরং চোর ও ছিনতাইকারীদের অর্থ দিয়ে আগাম ‘দাদন’ দিয়ে রাখে। এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট গ্যারেজে চোরাই অটোরিকশা সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এই চক্রের কর্মকাণ্ডে সরাসরি সহিংসতার ঘটনাও রয়েছে। টার্গেট করা রিকশা সংগ্রহের জন্য চালকদের হত্যা পর্যন্ত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার পর লাশ গুমের জন্য নদী বা নির্জন ঝোপঝাড়কে বেছে নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অপরাধীরা এককভাবে নয়, বরং দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। প্রত্যেক সদস্যের আলাদা দায়িত্ব থাকে। কেউ চুরি করে, কেউ পরিবহন করে, আবার কেউ গ্যারেজে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে।
বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় একাধিক গ্যারেজে প্রবেশ করে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রমের কিছু অংশ পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই চোরাই রিকশার হাতবদল হয় এবং আগে থেকেই ঠিক করা ক্রেতার কাছে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। স্থানীয় পর্যায়ের এই গ্যারেজগুলোই পুরো চক্রের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে বলে অনুসন্ধানে ইঙ্গিত মিলেছে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।
এক দশকের চক্রের কেন্দ্র আলম চান:
বাউনিয়া বাজার মসজিদ গলির আলম চানকে এলাকাবাসী রিকশা গ্যারেজ মালিক হিসেবে চেনেন। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি অন্তত এক দশক ধরে বৈধ গ্যারেজের আড়ালে চোরাই রিকশা কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। চক্রের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, তার গ্যারেজে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি চোরাই রিকশা আসে।
এসব রিকশা গ্যারেজে পৌঁছানোর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খুলে ফেলা হয় এবং যন্ত্রাংশ বদলে চেহারা পরিবর্তন করা হয়। মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই রিকশার রূপ বদলে যায় এবং তা দ্রুত বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। একই এলাকায় তার আরও দুটি গ্যারেজ রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে একটি বৈধ এবং অন্যটি চোরাই রিকশা রাখার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। চক্রটি সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় সক্রিয় বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
চোরাই রিকশা ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় সংগ্রহ করে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে একাধিকবার র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হলেও আলম চানের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এই বিষয়ে আলম চান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তার দাবি, প্রমাণ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারে।
আলম চানের গ্যারেজের পাশেই রয়েছে ইমরানের গ্যারেজ, যা স্থানীয়দের কাছে ভিন্ন নামে পরিচিত। অটোরিকশা চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ‘চোরা স্বপনের মেয়ের জামাই’র গ্যারেজ হিসেবে বেশি পরিচিত। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই গ্যারেজেও দুটি মেকানিক কাজ করে এবং একটি দাদনভিত্তিক চক্র গাবতলী, আমিনবাজার ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে চোরাই রিকশা সরবরাহ করে। স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিকভাবেই এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও ইমরানের বিরুদ্ধে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাভারের রিকশাচালক হুমায়ুন কবির হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিনতাই চক্রের সদস্যদের সঙ্গে আলম চান ও ইমরানের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য-প্রমাণ অনুসন্ধানকারীদের হাতে এসেছে। দাদনের টাকা, রিকশার চাহিদা এবং সরবরাহ সংক্রান্ত কথোপকথনের বিষয়ও এতে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলম চান।
লোকসান থেকে অপরাধে মোহর আলী:
বাউনিয়া বাঁধ এলাকার মোহর আলী আগে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে লোকসানের কারণে সেই ব্যবসা থেকে সরে আসেন তিনি। পরবর্তীতে চোরাই রিকশা চক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ গড়ে ওঠে বলে জানা যায়। বর্তমানে তিনি নিজস্ব গ্যারেজ না থাকলেও কম দামে চোরাই রিকশা কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে তাকে পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট গ্যারেজের এক মেকানিক জানান, তিনি শুধু কাজ করেন, বাণিজ্যিক বিষয়ে কিছু জানেন না।
ইদ্রিসের গ্যারেজে পুনঃপ্রস্তুতির কেন্দ্র:
বাউনিয়ার কলার আড়ত এলাকায় ইদ্রিসের গ্যারেজকে কেন্দ্র করেও একটি সক্রিয় চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রের দাবি, এখানে মাসে ৭০ থেকে ১০০টি চোরাই রিকশা পুনঃপ্রস্তুত করা হয়। গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যারেজটি দুই ভাগে বিভক্ত। সামনের অংশে বৈধ রিকশা রাখা হলেও ভেতরের অংশে পার্টিশনের আড়ালে সারিবদ্ধভাবে রাখা একাধিক রিকশা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এগুলোই চুরি ও ছিনতাই করে আনা রিকশা, যেগুলোর রূপ পরিবর্তন করে বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। ইদ্রিসের নিয়ন্ত্রণে ১০ থেকে ১২ জন সদস্য এই প্রক্রিয়ায় কাজ করে বলে জানা গেছে।
বাউনিয়া বাঁধের ই ব্লকে মমতাজের নামে একটি রিকশা গ্যারেজ রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মা-ছেলের গ্যারেজ’ নামে পরিচিত। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, এই গ্যারেজের নিয়ন্ত্রণে আছেন মমতাজ, আর পরিচালনার দায়িত্বে তার ছেলে ইসমাইল।
অভিযোগ রয়েছে, এখানে চোরাই অটোরিকশার যন্ত্রাংশ বদলে দ্রুত সময়ের মধ্যে রূপান্তর করা হয় এবং পরে সেগুলো বাজারে বিক্রি করা হয়। এ কাজে মমতাজের স্বামীও যুক্ত থাকতে পারেন বলে সূত্র দাবি করেছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে মমতাজ বা তার ছেলের কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
গত বুধবার বাউনিয়া বাঁধ এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে অধিকাংশই পরিচয় প্রকাশে অনাগ্রহ দেখান। নামগুলো শোনার পর তারা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে যখন চোরাই রিকশা সিন্ডিকেট নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, প্রায় সবাই একই ধরনের বক্তব্য দেন—তারা কিছু জানেন না। তবে দুইজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এসব বিষয়ে প্রশ্ন না করাই ভালো। তাদের ভাষায়, “আর কাউরে না জিগাইয়া এহান থাইকা যানগা। নইলে বড় বিপদে পড়বেন।”
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ধামরাইয়ের অটোরিকশা চালক হুমায়ুন কবির নিখোঁজ হন। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পাঁচ দিন পর সাভারের নামাবাজার এলাকার বংশী নদী থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা পরে হুমায়ুনের বলে শনাক্ত করে ঢাকা রেঞ্জ নৌপুলিশ।
তদন্তে নিশ্চিত হয়, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এই ঘটনায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে ছয়জন জড়িত ছিল বলে উঠে আসে, যার মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একজন এখনো পলাতক।
নৌপুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, চক্রটি পরিকল্পিতভাবে কাজ করত। প্রথমে একজন নারী সদস্য চালকের আস্থা অর্জনের জন্য সাহায্যের আবেদন করতেন। ঘটনার দিনও হুমায়ুনকে একই কৌশলে ফাঁদে ফেলা হয়। নারী সদস্য নারগিছ নিজেকে বিপদে পড়া মা পরিচয় দিয়ে সাহায্য চান। সঙ্গে থাকা একজন পুরুষ নিজেকে স্বামী হিসেবে পরিচয় দেন। মানবিকতা ও বাড়তি ভাড়ার প্রলোভনে চালক রিকশা নিয়ে তাদের সঙ্গে রওনা দেন।
পথে আরও কয়েকজন যোগ দেয় এবং পরিস্থিতিকে পারিবারিক সংকট হিসেবে উপস্থাপন করে আস্থা তৈরি করা হয়। এরপর চালককে পানীয় বা খাবারের মাধ্যমে অচেতন করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। অচেতন হওয়ার পর রিকশা ছিনতাই করে নেয় চক্রের সদস্যরা এবং পরবর্তীতে চালককে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, এ ধরনের চক্র সাধারণত একাধিক ঘুমের ওষুধ বা মানসিক রোগের ওষুধ গুঁড়া করে ব্যবহার করে। এগুলো কখনো পানীয় বা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে ভুক্তভোগীকে খাওয়ানো হয়। তার মতে, এসব ওষুধ দ্রুত অচেতন করে দিতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ও কিডনির ক্ষতি করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
নৌপুলিশের এক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, হুমায়ুন হত্যাকাণ্ডসহ গত দুই বছরে একই কৌশলে অন্তত ছয়জন চালক হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় একই ধরনের প্যাটার্ন অনুসরণ করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তার পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। নিহত চালকের ভাই ও মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন জানান, কিস্তিতে কেনা অটোরিকশার ঋণ এখনো শোধ হয়নি। আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়ে পরিবারটি চরম বিপাকে পড়েছে।
কে কীভাবে কাজ করে চক্রে:
গ্রেপ্তারদের মধ্যে নাঈম সরদারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পুরো চক্রের কার্যপ্রণালী উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, প্রতিটি সদস্যের আলাদা দায়িত্ব রয়েছে।
চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে স্বপন ওরফে কবিরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি স্পট নির্বাচন, রিকশাচালক টার্গেট করা এবং খাবারের মাধ্যমে চেতনানাশক প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন। ঘটনা শুরু করার জন্য নারী সদস্য নারগিছ এবং তার সঙ্গে থাকা আজিজ ব্যবহার করা হতো। তাদের মাধ্যমে ‘পারিবারিক বিপদ’ বা ‘হারিয়ে যাওয়া স্বজন’—এ ধরনের নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করা হতো, যাতে চালকের আস্থা অর্জন সহজ হয়।
এরপর মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হতো নাঈম ও বাবুল। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা কবিরের নির্দেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করত এবং অপারেশনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন করত। চালককে অচেতন অবস্থায় ফেলে দেওয়া, রিকশা নিয়ে পালানো এবং পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত তাদের ভূমিকা ছিল সক্রিয়। পরে বাবুল আবারও রিকশা বিক্রির প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকত এবং অর্থ হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখত বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সোবহান, যিনি পেশায় প্রাইভেটকার চালক, পুরো ঘটনাটি দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতেন বলে দাবি করা হয়েছে। তার স্ত্রী নারগিছ এই চক্রে যুক্ত থাকায় তিনি এতে জড়িয়ে পড়েন। বাবুলের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কও এই নেটওয়ার্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।
তদন্তে জানা যায়, হুমায়ুন কবির ছাড়াও এই একই চক্রের হাতে অন্তত আরও ছয়জন অটোরিকশা চালক হত্যার শিকার হয়েছেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সাভারের জিরাব এলাকা থেকে নিখোঁজ হন সাইফুল ইসলাম। কয়েক দিন পর তুরাগের একটি লেক থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তাররা পরে স্বীকার করে, এই হত্যাকাণ্ডেও তারা জড়িত ছিল।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় আব্দুর রহিম ভূঁইয়া এবং ২০২৫ সালের মার্চে গাছা এলাকার শাহাবুল ইসলাম একই কৌশলে নিখোঁজ হন এবং পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার হয়। এছাড়া আশরাফুল ইসলামসহ আরও দুইজন অটোরিকশা চালকের মৃত্যুর ঘটনাও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের করা একাধিক মামলার তথ্য যাচাই করে এসব সম্পর্ক নিশ্চিত করা হয়।
ঢাকা রেঞ্জ নৌপুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা প্রথমে নির্দিষ্ট নাম মনে করতে না পারলেও পরে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। তথ্য-প্রযুক্তি ও সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে এসব স্বীকারোক্তির সত্যতা যাচাই করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এটি একটি শক্তিশালী সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র। তার মতে, এ ধরনের নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি চোরাই রিকশার ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, টঙ্গী ও কেরানীগঞ্জকেন্দ্রিক একাধিক ছিনতাই চক্র ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, চক্রগুলো সাধারণত যাত্রীবেশে চালকের রিকশায় উঠে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর করে রিকশা ছিনতাই করে। পরে ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বিক্রি করা হয়। এ ধরনের আরও কিছু চক্র নজরদারিতে রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এই গল্প শুধু কয়েকটি রিকশা ছিনতাই বা কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়। এটি শহরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন এক অদৃশ্য বাস্তবতা, যেখানে সাধারণ একটি যানবাহনও কখন যে মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়—তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। যে রিকশা প্রতিদিন মানুষের জীবিকার বাহন, সেটিই যখন পরিকল্পিত অপরাধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্নটা আর শুধু অপরাধীদের নিয়ে থাকে না—প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও।
তদন্ত এখনো শেষ হয়নি, সব নাম-পরিচয় এখনো পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু একটি সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে—শহরের রাস্তায় শুধু চাকা ঘোরে না, কিছু অদৃশ্য নেটওয়ার্কও ঘুরতে থাকে, যা কখনো কখনো জীবন থামিয়ে দেয় চিরতরে। আর এই অন্ধকারের ভেতর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো এটাই—পরবর্তী নামটা কি আর কোনো হুমায়ুন হবে? সূত্র: কালবেলা
সিভি/এম

