দীর্ঘ ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের পরও সম্পদ ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অসংগতি নিয়ে আলোচনায় এসেছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। সর্বশেষ অর্থবছরে ১২৯ কোটি টাকা মুনাফা দেখালেও প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম দেখানো হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানিটির প্রায় ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৬২ হাজার টাকার মতো। এতে প্রতি বিঘার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই তথ্য প্রকাশের পর স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও বিস্ময় ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, জমির মূল্য বহু বছর ধরে পুনর্মূল্যায়ন না করায় এই অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন না করা একটি বড় ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী সম্পদের মোট মূল্য নির্ধারণেও তথ্যের ঘাটতি ছিল, ফলে সেগুলোর যথাযথ যাচাই সম্ভব হয়নি বলে নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন।
শুধু জমিই নয়, অন্যান্য সম্পদ হিসাবেও বড় ধরনের অস্পষ্টতা পাওয়া গেছে। আখসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনকারী গাছকে জৈবিক সম্পদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, ফলে প্রকৃত সম্পদের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে মোট সম্পদ। এতে আর্থিক বিবরণীর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মজুত পণ্য ও স্টোরসামগ্রী নিয়েও অসংগতি রয়েছে। প্রায় ৭২ কোটির বেশি টাকার মজুত পণ্য এবং ৩৪ কোটির বেশি টাকার স্টোরসামগ্রীর বিপরীতে পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি তালিকা পাওয়া যায়নি। এমনকি উৎপাদনাধীন পণ্যের মূল্য নির্ধারণেও নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের হিসাব নির্ধারণে সঠিক বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়নি, বিলম্বিত করের হিসাব রাখা হয়নি এবং নিয়মিত বার্ষিক রিটার্ন জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে কোম্পানিটি কর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার ওপর সুদ প্রদান করা হয়নি, যা শ্রম আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকেও বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই পরিস্থিতির জন্য পুরোনো হিসাব পদ্ধতিকে দায়ী করছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন আগে করা সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের ফলেই জমির মূল্য কম দেখানো হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন করে সম্পদের মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বোর্ড পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হালনাগাদ বাজারদরে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে রেকর্ড মুনাফা আর অন্যদিকে সম্পদ ও হিসাবের এই অসংগতি—দুটি বিষয়ই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তারা বলছেন, নিরপেক্ষ ও আধুনিক অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নির্ধারণ করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত সম্পদ, আয় ও দায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন হবে, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সিভি/কেএইচ

