আমরা গুপ্ত ছিলাম বলে আজকে তোমরা সরকারে। অতএব আমরা গুপ্ত, এটা আমাদের সম্মানের।এমন একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
গত রবিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি ভিডিওটি পোস্ট করেন। ভিডিওটি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের লোগোযুক্ত বলে দেখা গেছে। পোস্টের সঙ্গে রাকিব লিখেছেন, গুপ্ত টাইটেলের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকুক, সেই প্রত্যাশা রাখছি কিন্তু আপনার সমগোত্রীয় শ্রেণির প্রাণীদের গুপ্ত বললে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়, হামলা করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল ও নোংরা গালি দেয়।”
গত কয়েক দিনে ‘গুপ্ত’ শব্দ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। এরই মধ্যে ভার্চুয়াল জগতে বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে ঘিরে বটবাহিনীর অপতৎপরতার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট ও সমন্বিত প্রচারণার মাধ্যমে তারেক রহমানকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে— তার দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান, বিএনপি আমলের বিদ্যুৎ সংকট, গুলশান অফিস ও হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক দুর্নীতির অভিযোগ, এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতা সংক্রান্ত নানা দাবি। একই সঙ্গে বিএনপির আন্দোলন, খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক সরানো না পারা— এমন বিষয়ও এসব প্রচারণায় যুক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি একটি বিতর্কিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর পর উত্তেজনা আরও বাড়ে। ওই ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ’ দাবিতে মিছিল করে ছাত্রদল। মিছিলে “গুপ্ত রাজনীতি, চলবে না চলবে না”, “স্বৈরাচার আর রাজাকার মিলে মিশে একাকার”— এমন স্লোগানও শোনা যায়।
ছাত্রদলের দাবি, ওই ফটোকার্ডটি ইসলামী ছাত্রশিবিরপন্থি প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শেয়ার করেছিলেন। তবে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, ভাইরাল স্ক্রিনশটটি ভুয়া। এই ঘটনার পর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের আগের সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০০টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়। শুধু সাত দিনে ১৯০টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে ৯৩টি ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি— ২৯টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে নিয়ে।
এছাড়া দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও ভুয়া তথ্যের শিকার হন। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকেও লক্ষ্য করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বক্তব্য বিকৃত করে বা ভুয়া উদ্ধৃতি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।
বটবাহিনী নিয়ে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদনে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক (শাকিল চৌধুরী) বলেন, ফেসবুক এখন রাজনৈতিক প্রচারণার বড় মাধ্যম হলেও কিছু গোষ্ঠী এটি অপপ্রচারের জন্য ব্যবহার করছে।
তার ভাষায়, বিশেষ ইস্যুকে পুঁজি করে বটবাহিনী রাজনীতিকে নিজের দিকে নিয়ে আসতে চায়। এই বাহিনীর কাজই হলো সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো।” তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বট সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন,
রোবট শব্দের শেষ অংশ থেকেই ‘বট’ শব্দের উৎপত্তি। এটি স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম, যা নির্দিষ্ট কমান্ড অনুযায়ী কাজ করে।
তিনি বলেন, বট হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পোস্টে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার বা প্রতিক্রিয়া দিতে পারে। এমনকি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রচারণাকেও দ্রুত ভাইরাল করতে সক্ষম।
‘গুপ্ত’ শব্দকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন শুধু একটি শব্দে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণার প্রশ্ন। সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে অনলাইন তথ্যযুদ্ধ যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, এই ঘটনা তারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে উঠছে।

