অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই চক্রের একটি অংশ মন্ত্রণালয় ঘিরে কাজ করছে, আরেকটি অংশ সংগঠনকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী সামছুদ্দিন মাসুমের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি বদলির মাধ্যমে দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে। বর্তমানে একজন সিনিয়র সহকারী সচিব সেই অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
অন্যদিকে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিআরএসএ)-এর মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে আরেকটি প্রভাবশালী অংশ সক্রিয় রয়েছে। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত আছেন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই নেটওয়ার্কের বাইরে আরও কিছু সদস্যও বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত কোনো বদলি বা পদোন্নতির আদেশ হয়নি। তবে আগের সময়ের মতোই কিছু পক্ষ এখনো চাপ ও তদবির অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে জেলা রেজিস্ট্রার থেকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতির একটি ফাইল আগের সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেটি পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। একই সময়ে কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারের বদলির সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক আসিফ নজরুল আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই ২৩ আগস্ট তিনি একটি নির্দেশনায় নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা—জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্টদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদ বিবরণী জমা দিতে বলেন। এতে সময়সীমা দেওয়া হয় ১০ দিন।
এই নির্দেশনার চার দিনের মাথায় ২৭ আগস্ট সচিবালয়ে কয়েকজন জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বিক্ষোভ করেন। ওই সময় আলোচনায় আসেন মুন্সীগঞ্জ সদরের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। পরবর্তীতে বদলি ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকেই বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাব-রেজিস্ট্রার বদলির দর-কষাকষি রাজধানীর গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন অভিজাত স্থানে হতো বলেও দাবি করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে মাইকেল মহিউদ্দিন সংগঠনের ভেতরে প্রভাবশালী অবস্থানে চলে আসেন এবং পরে বিআরএসএ-এর মহাসচিব হন।
সংগঠনের নেতৃত্বে আসার পর তার মাধ্যমে একাধিক কর্মকর্তা পছন্দের জায়গায় বদলি হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে তিনি সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন।
তিনি এক বক্তব্যে বলেন, “সে সময় পরিস্থিতি ছিল অস্থির। সবাই চাপের মধ্যে ছিল। বদলি বা পদোন্নতিতে কারও একক নিয়ন্ত্রণ ছিল না।”
এছাড়া বিআরএসএ-এর কয়েকজন পদধারীর ক্ষেত্রেও লোভনীয় পোস্টিং পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কিছু কর্মকর্তা স্বল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার বদলি হয়ে সুবিধাজনক স্থানে নিয়োগ পেয়েছেন। কারও ক্ষেত্রে নিম্ন গ্রেডের পদ থেকেও উচ্চ গ্রেডের অফিসে পদায়নের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সংগঠনের বাইরে থেকেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা সিলেট থেকে ঢাকায় বদলি হন বলেও জানা যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আট মাসে মোট ২৮৬ জন কর্মকর্তার বদলি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি বদলি ঘুষের মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় শতকোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন যাচাই শেষ হয়নি বলে প্রশাসনের একাংশ জানিয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: খবরের কাগজ
সিভি/এম

