জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো ৭০১ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই বন্দিরা দেশের ভেতরে আত্মগোপনে আছেন নাকি সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে চলে গেছেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে অন্তত ৯ জন উগ্রপন্থি বা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। পলাতক বন্দিদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং বিচারাধীন মামলার হাজতিও রয়েছেন।
ওই একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, এখনো প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লক্ষাধিক গুলি উদ্ধার হয়নি। ফলে একদিকে পলাতক বন্দি, অন্যদিকে লুট হওয়া অস্ত্র—দুই বিষয়ই জননিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, বিপুল অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার না হওয়া এবং কারাগার থেকে পালানো অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করতে পারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় ব্যর্থতা। তাঁর মতে, এসব অস্ত্র ও পলাতক বন্দি ভবিষ্যতে বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য উগ্রবাদী হামলার শঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, অতীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় কিছু বন্দিকে ঢালাওভাবে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বিতর্কিত। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে অস্ত্র উদ্ধার ও পলাতকদের ধরতে যথেষ্ট মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না বলেও তিনি মনে করেন।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৫০ জন বন্দি পালিয়ে যান। পরে আত্মসমর্পণ ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ১ হাজার ৫৪৯ জনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ৭০১ জন পলাতক রয়েছেন।
তিনি জানান, পলাতকদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি। বাকিরা হত্যা, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন মামলায় বিচারাধীন হাজতি ছিলেন। এছাড়া অন্তত ৯ জনকে জঙ্গি বা উগ্রপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই তৎপরতা পর্যাপ্তভাবে দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র-গুলি উদ্ধারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অভিযান চলছে। এরই মধ্যে অনেক অস্ত্র উদ্ধার এবং কিছু পলাতককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবন ও সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কতা জারি করা হয়। সব ইউনিটকে নিরাপত্তা জোরদার এবং নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

