দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট কিন্তু এই খাতেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের জটিল ও অদৃশ্য ফাঁকির কাঠামো। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের সূক্ষ্ম সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব রাষ্ট্রকে না দিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি আয় কমছে, অন্যদিকে চাপ বাড়ছে সাধারণ করদাতাদের ওপর।
সমস্যার মূল কারণ হলো নীতিগত দুর্বলতা এবং নজরদারির ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় রাজস্ব ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ক্ষতি, যার পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট খাতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত আদায় সেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ভ্যাট গ্যাপ বা সম্ভাব্য আয় ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে পার্থক্য এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি। গবেষণা অনুযায়ী, মোট সম্ভাব্য ভ্যাট আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ফাঁকি, ছাড় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬) মোট রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের ঘাটতির চেয়েও ৫ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা বেশি। আগের অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এনবিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।
একক মাস হিসেবে মার্চে ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের মার্চের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় ঘাটতি আয়কর খাতে। এখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। ঘাটতি ৪০ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা।
ভ্যাট খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। কাস্টমস খাতে লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮০ হাজার ২২৩ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এখন করপোরেট ভ্যাট ফাঁকি সরাসরি আইন ভাঙার মাধ্যমে নয়, বরং আইনের ভেতরের সুযোগ ব্যবহার করে কর এড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কর বিশেষজ্ঞ দল থাকে, যারা আইনের ফাঁক কাজে লাগিয়ে কর দায় কমিয়ে আনে।
তিনি আরও বলেন, বিক্রয় কম দেখানো, আয়ের আন্ডার-রিপোর্টিং এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট ব্যবস্থার অপব্যবহার এই ফাঁকির অন্যতম মাধ্যম। এগুলো প্রমাণ ও যাচাই করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় করপোরেট গ্রুপগুলো একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজেদের মধ্যে লেনদেন দেখিয়ে জটিল কাঠামো তৈরি করছে। এতে খরচ ও আয় এমনভাবে সমন্বয় করা হয়, যাতে করযোগ্য আয় কমে যায়।
একইভাবে আমদানি-রফতানি খাতেও পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে ভ্যাট ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং চক্রের সাথেও যুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মুনাফা কম দেখিয়ে বিদেশে স্থানান্তর করছে, ফলে দেশে করযোগ্য আয় কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে কর ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে বিভিন্ন সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, ভ্যাট কাঠামোর জটিলতাও এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন হার, ছাড় ও অব্যাহতির কারণে পুরো ব্যবস্থা আরও জটিল হয়েছে। প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতিও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, ফলে বড় লেনদেনের ওপর তাৎক্ষণিক নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না।
এনবিআর জানিয়েছে, কিছু খাতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং ই-কমার্স, উৎপাদন ও সেবা খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সমস্যার তুলনায় এখনও সীমিত। রাজস্ব ঘাটতির প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে অর্থনীতিতে। সরকারের ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে, সুদের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আগামী অর্থবছর থেকেই কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে ভ্যাট কাঠামো সহজ করা, কর ছাড় কমানো, ই-ইনভয়েসিং বাধ্যতামূলক করা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত করা এবং বহুজাতিক কোম্পানির কর ফাঁকি রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
শুধু অভিযান দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। কার্যকর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া করপোরেট ভ্যাট ফাঁকি রোধ করা কঠিন হবে। না হলে রাজস্ব ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে।
সিভি/এম

