ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে গত ২৩ মার্চ বগুড়া কাস্টমস অফিসের সামনে প্রকাশ্যে খুন হন রকি মাহমুদ নামে এক ব্যবসায়ী। বেলা দেড়টার দিকে মহাসড়কের ওপর তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে এবং পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশে হত্যাকাণ্ড ও সহিংস অপরাধের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি করে হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে ২৫০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১৭টিতে। দুই মাসে মোট মামলা হয়েছে ৫৬৭টি। তুলনামূলকভাবে, ২০২৫ সালের একই সময়ে (ফেব্রুয়ারি ও মার্চ) হত্যা মামলা ছিল ৫৮৭টি। তার আগের বছর ২০২৪ সালে একই সময়ে মামলা ছিল ৪৭৯টি।
এই সময়ে শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আরও চাপের মধ্যে পড়েছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪২টি, মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে। অন্যদিকে ডাকাতির ঘটনা কিছুটা কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি ডাকাতির মামলা হলেও মার্চে তা কমে ৩৯টিতে নেমে আসে।
পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ১৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে আটজনের মরদেহ রহস্যজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এছাড়া গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। আধিপত্য বিস্তার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক বিরোধ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে।
এ অঞ্চলে এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে ঘুমন্ত শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং পারিবারিক বিরোধে সন্তান হাতে পিতা নিহত হয়েছেন। ১৪টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৭টি ঘটনায় ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বাকিদের এখনও আইনের আওতায় আনা যায়নি। কয়েকটি ঘটনার রহস্যও এখনো উদঘাটন হয়নি।
গত ২৭ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী থানার একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমিন আক্তার শেলী (২৭) নামে এক নারী আনসার সদস্যের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি বরিশালের শাহ আলম হাওলাদারের মেয়ে ছিলেন এবং আনসার বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
কদমতলী থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ মুশাহিদুল ইসলাম জানান, সুরতহাল শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার ভাষায়, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তাকে হত্যা করে দরজার বাইরে থেকে তালা দিয়ে অপরাধীরা পালিয়ে গেছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, দ্রুত খুনিদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব অনেক সময় তদন্তে বাধা সৃষ্টি করে। তাই এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। তার মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারে অপরাধীদের কৌশল বদলাচ্ছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা ও সোর্স নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সরকারের বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যানেও হত্যাকাণ্ডের উচ্চ প্রবণতা দেখা যায়। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৯ থেকে ১০টি করে হত্যা মামলা প্রতিদিন নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে মোট ৩ হাজার ২৩টি হত্যা মামলা হয়। ২০২২ সালে ছিল ৩ হাজার ১২৬টি, ২০২১ সালে ৩ হাজার ২১৪টি, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৫৩৯টি এবং ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫৩টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সাফল্যও এসেছে। তার দাবি, “অতীতের তুলনায় অনেক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ভবিষ্যতে এসব অপরাধ আরও কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ বলছে, দেশে হত্যাকাণ্ড ও সহিংস অপরাধ এখনো বড় একটি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়িক বিরোধ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব—সব ক্ষেত্রেই সহিংসতার ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে।

