ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ‘হ্যাঁ’ গণভোটকে ঘিরে প্রচার কার্যক্রমে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে একাধিক সংগঠনকে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে এই অর্থ কীভাবে বণ্টন হয়েছে, কারা পেয়েছে এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে—এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
গণভোটের প্রচার কার্যক্রমে অর্থ লেনদেন ঘিরে স্বচ্ছতার অভাব ও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিষয়টি নিয়ে চাপের মুখে পড়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে অডিট তদন্ত শুরু করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যমান নীতিমালায় এ ধরনের খাতে সিএসআর অর্থ ব্যয়ের সুযোগ আছে কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি। পাশাপাশি যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে—এ বিষয়েও নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সিএসআর অর্থ সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের মতো খাতে ব্যবহারের কথা থাকলেও নির্বাচনি প্রচারে এর ব্যবহার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এদিকে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অর্থ প্রদান নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনার ভিত্তিতেই হয়েছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গণভোট আয়োজনের জন্য এবার ইসির অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে গণভোটসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক জনসচেতনতা তৈরির প্রচারে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা নির্বাচনি ইতিহাসে নতুন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বরাদ্দ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এর বাইরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা কার্যক্রমে অর্থ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকেও আলাদা অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সিএসআর তহবিল থেকে বিভিন্ন সংগঠনও অর্থ পেয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা পেয়েছে। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি পেয়েছে ২০ লাখ টাকা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (এবিবি)-এর মাধ্যমে এই অর্থ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব অর্থ বিতর্ক ও প্রচার কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে দেওয়া অর্থ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি টাকা গ্রহণ করেন এবং তা সংগঠনের ভেতরে গোপন রাখা হয়। পরে একাংশের নেতারা সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, এই অর্থের স্বচ্ছ হিসাব নেই এবং তা তছরুপ করা হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন রিফাত রশিদ, মঈনুল ইসলাম ও হাসিব আল ইসলাম। তবে রিফাত রশিদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নিয়ম মেনেই অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে এবং নিরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—একটি অনিবন্ধিত সংগঠন কীভাবে রাষ্ট্রীয় আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে অর্থ পেল। জানা গেছে, সরাসরি অর্থ দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় একটি নিবন্ধিত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়। এতে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা চলছে। ব্যাংকগুলোকে জনসচেতনতা তৈরির নামে প্রচার কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেই অর্থ সিএসআর তহবিল থেকে ব্যবহারের কথা বলা হয়। যদিও এটিকে রাজনৈতিক প্রচার নয়, বরং সচেতনতামূলক কার্যক্রম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, বাস্তবে এটি একপক্ষীয় প্রচারের সঙ্গে মিশে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিভিন্ন সংগঠনকে অর্থ দেওয়া হলেও তার ব্যবহার ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে অর্থ লোপাট ও তথ্য গোপনের অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে সাধারণভাবে সিএসআর তহবিলের উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে নির্বাচনি প্রচারে অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, সিএসআর অর্থ কোন নীতিমালার আওতায় ব্যয় হয়েছে এবং তা কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট করা উচিত। তাঁর মতে, নীতিমালার বাইরে ব্যয় হলে তা সিএসআর-এর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, অর্থের উৎস, ব্যবহার ও নিরীক্ষা জনগণের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি, না হলে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন জানান, ব্যাংকগুলো নীতিমালা মেনেই সিএসআর অর্থ দিয়েছে। তবে এ ধরনের খাতে স্বচ্ছতা ও স্পষ্ট গাইডলাইন থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ ও পরামর্শ অনুযায়ী অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং ব্যয়ের দায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ওপরই বর্তায়।
নির্বাচন কমিশনও এই অর্থ বণ্টন প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। ইসি কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, কারা অর্থ পেয়েছে বা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, সে তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সরাসরি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়।
সব মিলিয়ে গণভোট প্রচারে সরকারি ও বেসরকারি অর্থ প্রবাহে সমন্বিত কাঠামোর অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে কমিশন দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে মন্ত্রণালয় ও সংগঠনগুলোর ব্যয়ের স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে না। এতে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করে একপক্ষীয় প্রচার চালানো হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাশাপাশি সিএসআর তহবিলের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রচারে এর ব্যবহার করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

