দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগে ভয়াবহ জালিয়াতির একটি ঘটনা সামনে এসেছে। তথ্য গোপন ও জামিনের আদেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এক মামলার প্রধান আসামিকে কারাগার থেকে মুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিচারাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম। তিনি চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার পোশাক কারখানা ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর মালিক। অভিযোগ রয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যদের জন্য তৈরি করা বিপুল পরিমাণ পোশাক জব্দের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি জালিয়াতির আশ্রয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান।
যেভাবে ঘটেছে জালিয়াতি:
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রায় সাত মাস আগে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে তথ্য গোপন করে হাইকোর্ট থেকে একটি জামিন আদেশ নেওয়া হয়। পরে সেই আদেশে থাকা তথ্য পরিবর্তন করে নতুন মামলার নম্বর ও থানার নাম যুক্ত করা হয়। এরপর জাল করা ওই নথি সংশ্লিষ্ট কারাগারে জমা দেওয়া হলে সেটিকে বৈধ আদেশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সেই নথির ভিত্তিতেই সাহেদুল ইসলাম গোপনে মুক্তি পান।
সাত মাস পর সামনে আসে ঘটনা:
দীর্ঘ সময় বিষয়টি আড়ালেই ছিল। তবে সম্প্রতি একই মামলার আরেক আসামির জামিন শুনানির সময় ঘটনাটি সামনে আসে। আদালতে সাহেদুল ইসলামের জামিনের উদাহরণ তুলে ধরলে বিচারক ও রাষ্ট্রপক্ষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, আদালতের মূল রেকর্ডের সঙ্গে উপস্থাপিত জামিন আদেশের কোনো মিল নেই। তখনই স্পষ্ট হয় যে আদেশটি জাল করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির কড়া নির্দেশ:
ঘটনাটি জানার পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বিষয়টি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নজরে আনেন। প্রধান বিচারপতি তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তের নির্দেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের শনাক্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, তদন্তকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ কর্মকর্তা বা ফৌজদারি শাখার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনজীবীদের অনেকে মনে করছেন, আদালতের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর ধারণা ছাড়া এ ধরনের সূক্ষ্ম জালিয়াতি সম্ভব নয়। তারা জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
যে মামলাকে ঘিরে বিতর্ক:
২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় রিংভো অ্যাপারেলসের একটি গুদামে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে কেএনএফ সদস্যদের জন্য তৈরি করা ২০ হাজার ৩০০টি বিশেষ পোশাক জব্দ করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে এসব পোশাক তৈরির অর্ডার নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় সাহেদুল ইসলাম ছাড়াও গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দারকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে জালিয়াতির মাধ্যমে সাহেদুল ইসলাম কারাগার থেকে মুক্ত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উল্লেখ্য, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি সশস্ত্র সংগঠন। পাহাড়ি অঞ্চলে সংগঠনটি ‘বম পার্টি’ নামেও পরিচিত।

