বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজার ও সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
অভিযোগে সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য জিল্লুর রহমান, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক, বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) আব্দুল মতিন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম তালুকদার ও সাঈদুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স, এনডিএ ও এমএম বিল্ডার্সের মালিকদের বিরুদ্ধেও যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরস্পরের সহযোগিতায় ব্যক্তিস্বার্থে লাভবান হয়েছেন। একই সঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্য, কার্গো ভ্যাসেলের লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ ইস্যুতে ঘুষ লেনদেনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
দুদকের সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াত এ বিষয়ে জানান, প্রকল্পটি সংশোধন করে নতুনভাবে বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়ে আইনগত ব্যবস্থার সুপারিশ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দুদকে কমিশন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
২০১৮ সালে বিআইডব্লিউটিএ ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এতে ৩৫টি ড্রেজার, ১৬১টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ, তিনটি ড্রেজার বেজ এবং একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত।
পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। একই সঙ্গে ব্যয়ও বাড়িয়ে ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। দুই দফা মেয়াদ বাড়লেও দীর্ঘ আট বছরে প্রকল্পের অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্পের মোট ৬১টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩৪টি প্যাকেজের কাজ এখনও ঝুলে আছে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে কয়েকটি প্যাকেজের চুক্তিমূল্য প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি ধরা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্যাকেজ-৭, ৮, ১০ ও ১২ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় আসেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি নিজের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আলী আজগর ফকির দুদকে অভিযোগ দায়ের করেন। পরে দুদক প্রকল্পটির দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন নথিপত্র তলব করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত কার্যালয়ে তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের কর্মকর্তারা।

