চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ব্যবহারে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে। গ্যাসের চাপের হিসাব কারসাজি করে প্রায় ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ওই অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনাটি ঘিরে শিল্প ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একই ঘটনায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বিক্রয় উত্তর-১ বিভাগের এক ব্যবস্থাপক আব্দুল বাতিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চাপের হিসাব পরিবর্তনে আর্থিক ক্ষতি:
চট্টগ্রামের বাহির সিগন্যাল এলাকায় অবস্থিত সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রেসার ২.৯৬৯ পিএসআইজি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নথিপত্রে তা ২.৬২৯ দেখিয়ে বিল প্রস্তুত করা হয়। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির চিঠিতে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী ২৯ পিএসআইজি চাপের ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের নিয়ম রয়েছে। গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী-২০১৪ অনুযায়ী এই চাপের জন্য প্রেসার ফ্যাক্টর নির্ধারিত ২.৯৬৯।
২০১০ সাল থেকে এই নিয়ম অনুসরণ করা হলেও ২০১৮ সালের ২২ জুলাই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির সময় কারসাজির মাধ্যমে প্রেসার ফ্যাক্টর পরিবর্তন করে ২.৬২৯ দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা কম বিল আদায় হয়েছে।
১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা আদায়ের নির্দেশ:
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বিক্রয় উত্তর-১ বিভাগের চিঠিতে জানানো হয়েছে, সঠিক প্রেসার ফ্যাক্টর ২.৯৬৯ অনুযায়ী ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত পাওনা হিসেবে ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা আদায়যোগ্য। এই অর্থ পে-অর্ডার বা রাজস্ব শাখায় জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক আব্দুল বাতিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাকে নিয়ে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।এ বিষয়ে আরও তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গ্যাস চাপ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালাউদ্দিন জানান, এখনো এরিয়ার বিল পরিশোধ করা হয়নি। বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিচারাধীন থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশনের নির্দেশনার ভিত্তিতে কয়েকজন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
টিকে গ্রুপের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সংযোগ নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে।
এনওসি ছাড়াই সংযোগ নেওয়া এবং ভূয়া চিঠির মাধ্যমে অনুমোদন পাওয়ার অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কোম্পানির ১৬৯তম বোর্ড সভায় কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের ১৬.৮ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ প্ল্যান্টে গ্যাস সংযোগের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের এখতিয়ার না থাকলেও ওই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ভূয়া নথির ব্যবহার হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার সময়ে টিকে গ্রুপের কিছু নথিতে অনিয়ম পাওয়া গিয়েছিল। আরও যাচাই করলে নতুন তথ্য বের হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও দাবি করেন, পূর্ববর্তী সময়ে জ্বালানি উপদেষ্টার দপ্তর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করা হতো।
অন্যদিকে টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

