গাজীপুর জেলা পরিষদের সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি এক দিনে প্রায় ৬২ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভেঙে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এফডিআর ভাঙা কিংবা নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব বিধান উপেক্ষা করেই এই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ আবার নতুন অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। সিইও মো. নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, এ কাজ প্রশাসকের অনুমতিক্রমেই করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসক সেই দাবি অস্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে এই অর্থ উত্তোলনের ঘটনাটি সামনে আসে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পে-অর্ডার আকারে উত্তোলিত এই বিপুল অর্থ সিইওর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। মো. নজরুল ইসলাম গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা পরিষদের সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি কুমিল্লায় পাঁচ মাস এবং শরীয়তপুরে চার মাস দায়িত্ব পালন করেন। ওই সব কর্মস্থলেও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা বিতর্কের কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়।
গাজীপুরে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার কর্মকাণ্ড আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। এর ধারাবাহিকতায় এই ৬২ কোটি টাকার এফডিআর ভাঙার ঘটনা সামনে আসে, যা এখন প্রশাসনিক তদন্ত ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর জেলা পরিষদের নামে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে আগে থেকেই ৬২ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে। এই এফডিআর থেকে অর্জিত সুদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
আর্থিক নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদি এফডিআর নির্ধারিত সময়ের আগে ভাঙলে সাধারণত সুদ বা মুনাফার সুবিধা হারিয়ে যায়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নজরুল ইসলাম স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এবং যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই একযোগে ১৪টি ব্যাংকের এফডিআর ভাঙার নির্দেশ দেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল তিনি পৃথকভাবে ১৪টি ব্যাংকে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠান। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক (জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা), জনতা ব্যাংক (গাজীপুর শাখা), আইএফআইসি ব্যাংক (বোর্ডবাজার শাখা), এনআরবি ব্যাংক (মাওনা শাখা), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা), রূপালী ব্যাংক (জয়দেবপুর শাখা), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (আওড়াখালী শাখা ও জয়দেবপুর শাখা) এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক (জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা)।
চিঠিতে সিইও নজরুল ইসলাম ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে উল্লেখ করেন, গাজীপুর জেলা পরিষদের নামে থাকা সংশ্লিষ্ট এফডিআরের সুদসহ সম্পূর্ণ অর্থ জেলা পরিষদের অনুকূলে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাংকগুলোর কাছে ওই অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। একই ধরনের বক্তব্য প্রায় সব ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতেও উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ জেলা পরিষদের অনুকূলে পাঠায় এবং এ সংক্রান্ত চিঠির অনুলিপি স্থানীয় সরকার বিভাগের ঢাকা বিভাগের পরিচালক, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং হিসাবরক্ষকের কাছেও পাঠানো হয়। এতে বিষয়টি ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আসে। এদিকে, পরিষদের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই সিইও নজরুল ইসলাম জানান, উত্তোলিত এফডিআরের অর্থ নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে পুনরায় জমা দেওয়া হবে।

