নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় একসময় মাছ ধরেই জীবিকা চালাতেন শাকের মাঝি। জীবন চলত ট্রলারে জাল ফেলে, দিন শেষে সামান্য আয়ে কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় নদী-সাগরের বাস্তবতা। মাছের পরিমাণ কমতে থাকায় আয়ও নেমে আসে তলানিতে।
২০০৭ সালের দিকে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর সামনে। এর আগেই ওই অঞ্চলে সমুদ্রপথে মানবপাচারের একটি চক্র গড়ে উঠছিল, যা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। শাকের মাঝির চোখের সামনে দিয়েই মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে মানুষ বিদেশে পাচার হতে থাকে।
ঠিক সেই সময়ই তাঁর জীবনে আসে এক মোড় ঘোরানো প্রস্তাব। পাচারচক্রের এক হোতা তাঁকে জানায়—ট্রলারে একজন যাত্রী বহন করতে পারলেই পাওয়া যাবে ২০ হাজার টাকা। গভীর সমুদ্রে দিনের পর দিন মাছ ধরে যে আয় হয়, তার তুলনায় এই প্রস্তাব ছিল অনেক বেশি লাভজনক। শাকের মাঝির কাছে বিষয়টি ছিল বিস্ময়কর।
এর পরই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা। মাছ শিকার থেকে ধীরে ধীরে তিনি জড়িয়ে পড়েন মানুষ পাচারের কাজে। প্রথম দিকে দরিদ্র তরুণদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে রাজি করানো হতো। পরবর্তীতে সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় ভয়াবহতা—প্রলোভনের পাশাপাশি শুরু হয় অপহরণ।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে একটি সংগঠিত চক্র। প্রায় ১৯ বছরের ব্যবধানে শাকের মাঝি স্থানীয়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত একজন প্রভাবশালী মাঝি হিসেবে। কেজি দরে মাছ বিক্রির জায়গায় শুরু হয় মাথাপিছু মানুষ বিক্রির মতো ভয়াবহ ব্যবসা। গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে প্রায় পৌনে ৩০০ যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর কক্সবাজার অঞ্চলের মানবপাচার ও অপহরণ কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান আরও তীব্র হয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, শুরুতে এই চক্রটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে পাচার কার্যক্রম চালাত। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো কিছু যাত্রীর সফলতার গল্প প্রচার করে নতুন যাত্রী সংগ্রহ করা হতো। এতে চাহিদা বাড়ে এবং ট্রলার ও যাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। মাঝসমুদ্রে একাধিক ট্রলারডুবি ও প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে যাত্রী সংকট দেখা দেয়। এরপরই চক্রটি অপহরণকে মূল কৌশল হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। এরপর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও বাড়তে থাকে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে একাধিক স্তরের সিন্ডিকেট—দালাল, মাঝি, অপহরণকারী, প্রবাসফেরত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের সদস্যরা। সবাই মিলে গড়ে তুলেছে একটি বিস্তৃত মানবপাচার নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে অন্তত ১৫ জনের বেশি মূল হোতার তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের অনেকেই আগে সাধারণ জেলে বা মাঝি ছিলেন। কেউ কেউ আবার অটোরিকশাচালক হিসেবেও কাজ করতেন, পরে ধীরে ধীরে যুক্ত হন অপহরণ ও পাচার চক্রে।
টেকনাফ ও উখিয়া এলাকায় অন্তত ১১টি ঘাট বা পয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে, যেখান থেকে এসব অবৈধ যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে কচ্ছপিয়া, সাবরাং, মহেশখালীপাড়া, রাজারছড়া, তুলাতলী, হাবিবছড়া, নোয়াখালীপাড়া, হাজমপাড়া, শীলখালী, ইলিয়াস কোবরা ঘাট এবং ইনানী অন্যতম। বিশেষ করে সাবরাং, মহেশখালীপাড়া ও নোয়াখালীপাড়া থেকে পাচারের ঘটনা বেশি ঘটে।
এক রোহিঙ্গা নাগরিক আবু তৈয়বের দেওয়া তথ্য এই চক্রের বিস্তার সম্পর্কে আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তাঁর দাবি, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। ছোট নৌকা থেকে বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হতো যাত্রীদের।
৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে উদ্ধার হওয়া ৯ জন ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। একই ঘটনায় ট্রলারডুবিতে আড়াই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া কয়েকজন জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্য হিসেবে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। এ ঘটনায় টেকনাফ থানায় মামলা হয়।
‘এফভি তানজিনা সুলতানা’ নামের ওই মাছধরা ট্রলারটি ব্যবহার করা হয়েছিল এই যাত্রায়। এতে অন্তত ২৬০ জন যাত্রী ছিল বলে জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সমুদ্রপথের এই অন্ধকার জাল এখন শুধু পাচারের গল্প নয়, বরং এক ভয়াবহ মানববাণিজ্য চক্রের বাস্তব চিত্র হিসেবে সামনে এসেছে, যা স্থানীয় জীবিকা, নিরাপত্তা এবং মানবজীবনকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
এক লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়া খাটেন সৈয়দ মাঝি:
কক্সবাজারের ট্রলারডুবি ও মানবপাচার ঘটনাকে ঘিরে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নতুন তথ্য। ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝি হিসেবে নাম এসেছে সৈয়দ আলম ওরফে সৈয়দ মাঝির। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার জেলা কারাগারে আটক রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া ৯ জনের মধ্যে তিনিও ছিলেন। ভুক্তভোগী রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রফিক একাধিকবার তাকে ট্রলারের মাঝি হিসেবে শনাক্ত করেন।
তথ্য যাচাইয়ে ২৬ এপ্রিল কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে অনুসন্ধান দল কক্সবাজার জেলা কারাগারে সৈয়দ আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। প্রায় ৪০ মিনিটের আলাপে তিনি নিজেকে ট্রলারের যাত্রী বা ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করেন। তবে একাধিক প্রশ্নের জবাবে তার বক্তব্য অসংলগ্ন ছিল।
পরবর্তীতে খুরুশকুল রাস্তার মাথায় তাঁর কথিত বাড়ি অনুসন্ধানেও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তিনি নিজেকে অটোরিকশাচালক বললেও তার সত্যতা মেলেনি। পরে তাঁর বাবার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সৈয়দ আলম পেশায় রাজমিস্ত্রি। বাবা-ছেলের বক্তব্যে স্পষ্ট গরমিল পাওয়া যায়। একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সৈয়দ আলমই ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝি ছিলেন। এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে এই কাজে যুক্ত করেন শাকের মাঝি। একই সঙ্গে তার বড় ভাই নানা মাঝিও এই চক্রে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ও নতুন তথ্য:
গত ৩ মে গ্রেপ্তার আসামিদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সনজীব কান্তি নাথ জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা কেউই দায় স্বীকার করেননি। বরং একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছে। তবে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
একটি তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে একাধিক আসামি সৈয়দ আলমকে দোষারোপ করেছেন। পাশাপাশি কক্সবাজারের ফয়েজ ওরফে নানা মাঝির সম্পৃক্ততার বিষয়ও উঠে এসেছে। তদন্ত অনুযায়ী, সৈয়দ আলম ও নানা মাঝি আপন ভাই এবং দুজনই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত। সূত্র আরও জানায়, তাঁদের আরেক ভাই নজরুল ইসলামও এই চক্রে জড়িত ছিলেন। তিনি বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। অন্যদিকে গোয়েন্দা সূত্রে জাকারিয়া নামের আরেক ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্ত ও একাধিক সূত্র অনুযায়ী, টেকনাফভিত্তিক এই মানবপাচার চক্রের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন নানা মাঝি। কক্সবাজার শহরে বাড়ি থাকলেও তিনি টেকনাফের দক্ষিণ মুহুরীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি মালয়েশিয়াপ্রবাসী মৌলভি আব্দুর রহিমের হয়ে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে যাত্রী সংগ্রহ, ট্রলার প্রস্তুত এবং মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচার কার্যক্রম সমন্বয় করা। সূত্র জানায়, ৮ এপ্রিল ট্রলারডুবির আগেও একটি ট্রলার যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পৌঁছে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন নানা মাঝি।
অনুসন্ধানে রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রফিকের নামও উঠে এসেছে, যিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পূর্ব বাজারপাড়ার বাসিন্দা জাহিদ হোসেনের ছেলে জিয়াউর রহমান (১৭) পাচারের ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে রফিকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে।
ভুক্তভোগীর ভাই আব্দুর রহমান জানান, ৮ এপ্রিল ট্রলারডুবির পর ১২ এপ্রিল সকালে তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি মিসডকল আসে। পরে কলব্যাক করলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে রফিক পরিচয় দিয়ে জিয়াউরের ছবি চান। ছবি পাঠানোর পর বিকেলে আবার ফোন করে তিনি জানান, জিয়াউরকে ফেরত পেতে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর থেকে ওই নম্বরটি আর যোগাযোগ করেনি। পরিবারটি তখনই নিশ্চিত হয় যে এটি একটি মানবপাচার চক্রের অংশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রফিক একজন রোহিঙ্গা নাগরিক। তার জন্মস্থান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুংডু এলাকায়। নাফ নদ পেরিয়ে তিনি টেকনাফে আসেন এবং পরে মালয়েশিয়ায় গিয়ে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন।
মাছ শিকার থেকে মানুষ শিকারের অন্ধকার পথ:
কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়াগামী সমুদ্রপথে শত শত মানুষের মরণযাত্রা কীভাবে শুরু হলো, সেই অনুসন্ধানে উঠে আসে এক নাম—মৌলভি আব্দুর রহিম। একসময় তিনি শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণপাড়ায় বসবাস করতেন। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যে, তিনি তখন থেকেই “আদম ব্যবসায়ী” হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৫ সালের দিকে তিনি নিজেই একটি ট্রলারে কিছু মানুষ নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেই যাত্রা সফল হয়। সেখান থেকেই তিনি সমুদ্রপথের একটি সহজ রুট আবিষ্কার করেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন পাচারের কৌশল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন এই সমুদ্রপথের মানবপাচার নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
সূত্র বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়াগামী এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। তবে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৫ সালে, যখন থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের গভীর জঙ্গলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। ওই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর কিছু সময় কমলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপহরণ ও মানবপাচারের ঘটনা আবারও বেড়েছে।
অনুসন্ধানে আব্দুর রহিমের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁদের কেউ কেউ আগে তার সঙ্গে মানবপাচার নিয়ন্ত্রণে যুক্ত থাকলেও এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। উখিয়ার জুম্মাপাড়ার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মৌলভি আব্দুর রহিম যখন দেশে থাকতেন, তখন থাইল্যান্ডের কার্যক্রম আমি দেখভাল করতাম।”
তিনি জানান, অধিকাংশ সময় তাঁকে থাইল্যান্ডে অবস্থান করতে হতো। সেখানেই ট্রলারের যাত্রীদের উপকূল থেকে নিয়ে গহিন জঙ্গলে আটকে রাখা হতো। পরে মুক্তিপণের জন্য তাঁদের জিম্মি রাখা হতো। গণকবরের ঘটনাগুলোর পর তিনি এই কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন।
স্থানীয়দের স্মৃতি ও ভয়াবহ চিত্র:
টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ মাঝেরপাড়ার জেলে নৌকাঘাটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর মৌলভি রহিম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি বলেন, “২০০৪ সালের আগ থেকেই শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণপাড়ায় থাকতেন রহিম। তখন মোবাইল ফোন কম থাকলেও তাঁর কাছে তিন-চারটি মোবাইল দেখেছি। তখন তিনি হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০৫ সালে নিজেই ট্রলার নিয়ে মালয়েশিয়া যান।”
গফুরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে রহিমের একটি মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে বহু বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। সেই সময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন রোহিঙ্গা নাগরিক। এরপর থেকেই তাঁর সিন্ডিকেট বড় হতে থাকে। সর্বশেষ ২০১২ সালে তাঁকে টেকনাফে দেখা যায়। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডে দামি গাড়ি ও বডিগার্ড নিয়ে চলাফেরা করেন বলে শোনা যায়।
অনুসন্ধানে মৌলভি রহিমের চারজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর নাম পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন মো. আইয়ুব, নাইমুল, ইসমাইল এবং তাঁর জেঠাতো ভাই ইলিয়াস। সূত্র অনুযায়ী, তাঁরা নিয়মিতভাবে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে চক্রের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
দেশের ভেতরে এই নেটওয়ার্কের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন মো. ফয়েজ ওরফে নানা মাঝি। তাঁর নেতৃত্বে টেকনাফজুড়ে শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি প্রলোভনের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের যুক্ত করার কাজে আরও অনেকে জড়িত। অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতেও এই চক্রের বিস্তার রয়েছে। ৩৩টি ক্যাম্পের প্রতিটিতে তিন থেকে চারজন করে এজেন্ট কাজ করে বলে জানা গেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন সৈয়দ হোসেন নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিক।
ভয়ংকর অপহরক শাকের মাঝি:
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মুণ্ডা ডেইল এলাকার শাকের আহমদ ওরফে শাকের মাঝি এখন মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের এক আলোচিত নাম। নিরক্ষর এই ব্যক্তি শৈশবে ছিলেন সাধারণ জেলে। বয়স ৪৫ বছর। তাঁর বাবা কবির আহমদ কৃষিকাজ করেন। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮ এপ্রিলের ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ অনেক ভুক্তভোগীর পরিবার শাকের মাঝির নামই বেশি উচ্চারণ করছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রলোভন দেখিয়ে তিনি বহু তরুণকে মরণযাত্রায় পাঠিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালের দিকে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার আগে থেকেই তিনি মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথমদিকে তিনি স্থানীয় তরুণদের ছোট নৌকায় তুলে ট্রলারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।
একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “শাকের মাঝি একসময় শান্ত স্বভাবের জেলে ছিলেন কিন্তু ২০০১ সালে মিয়ানমারে একটি গরুবাহী ট্রলার ডাকাতির ঘটনায় জড়ানোর পর থেকেই তার মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি মানবপাচার ও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।”
মাদক নিয়ন্ত্রণের সময় সরকার যখন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা করে, তখন শাকের মাঝির নামও সেখানে আসে। ২০১৯ সালে ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং প্রায় দুই বছর কারাভোগ করেন। তবে কারামুক্তির পর আবারও তিনি অপহরণ ও মানবপাচার চক্রে সক্রিয় হন।
স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে মুণ্ডা ডেইল এলাকায় শাকের মাঝির একটি দোতলা বাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি তাঁর তিনটি নৌকা এবং প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের জমি রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এসব সম্পদের প্রকৃত মূল্য কোটি টাকারও বেশি। পুলিশ সূত্র জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি ইয়াবা ও তিনটি মানবপাচারের মামলা রয়েছে। টেকনাফ থানার এসআই সনজীব কান্তি নাথ জানান, ১৩ এপ্রিল শাকের মাঝির দুটি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। নৌকাগুলো মানবপাচারে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শাকের মাঝির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ এসেছে টেকনাফের মাছ ব্যবসায়ী শামসুল আলম কাজলের কাছ থেকে। তিনি জানান, গত মার্চে তাঁর ছেলে সাদ কামালকে (২০) অপহরণ করা হয়। পরে আরেক ছেলে সাইফুলকে খুঁজতে গিয়ে তিনিও রেংগুর বিল এলাকার একটি গুদামে জিম্মি হন। পরবর্তীতে দুই ভাইকেই একসঙ্গে ট্রলারে করে থাইল্যান্ডে পাচার করা হয়।
কাজলের অভিযোগ, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে জিম্মি রেখে তাঁদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অনেক কষ্টে চার লাখ টাকা জোগাড় করে দিলে সাদ কামালকে ছেড়ে দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সাইফুল গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়ে থাইল্যান্ডের বন্দিশালাতেই মারা যান। গত ১৭ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুর খবর আসে পরিবারের কাছে। তিনি আরও জানান, এর আগেও রেংগুর বিলে অস্ত্রের মুখে তাঁর দুই ছেলেকে জিম্মি করা হয়েছিল। দেরিতে টাকা জোগাড় হওয়ায় তাদের পাচার করে দেওয়া হয়।
৮ এপ্রিলের ঘটনার পর গা ঢাকা দিলেও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে শাকের মাঝি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমি গরিব অসহায় ছেলেদের সহযোগিতা করেছি। আমি একজন জেলে। ইয়াবা ব্যবসার পর আত্মসমর্পণ করেছি এবং জেল খেটে এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেদের লোকজনকে বাঁচাতে আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।”
রোহিঙ্গা শিবিরকেন্দ্রিক মানবপাচার ও অপহরণ চক্রে নতুন করে উঠে এসেছে সৈয়দ হোসেন নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিকের নাম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বিশেষভাবে রোহিঙ্গা তরুণীদের টার্গেট করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে উখিয়ায় বসবাস করছেন। এর আগে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাচিডং থানার শিলখালীর নাটমোড়াপাড়ায় তাঁর আদি বাড়ি। তখন থেকেই তিনি সীমান্তপথে মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়। বর্তমানে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে না থেকে কক্সবাজারের এপিবিএন হাউজিং এলাকার পাশে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফে থাকা ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সৈয়দ হোসেনের অন্তত শতাধিক সক্রিয় সদস্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, যেখানে ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে নির্দেশনা ও তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। এই নেটওয়ার্কের নজর মূলত রোহিঙ্গা নারীদের দিকে, বিশেষ করে অবিবাহিত তরুণীদের দিকে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রলোভন দেখিয়ে বা জোরপূর্বক অপহরণ করে পাচারচক্রে যুক্ত করা হয়।
অনুসন্ধান বলছে, স্থানীয় খুচরা দালালদের নিয়ন্ত্রণ করেন সৈয়দ হোসেন। যে কেউ প্রলোভন দেখিয়ে বা অপহরণ করে ভুক্তভোগী সংগ্রহ করলে তাকে প্রথমে হোসেনের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এরপর হোসেন আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের প্রধান আবদুর রহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের ট্রলারে করে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের দিকে পাঠানো হয়।
টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের একাধিক হোতার পরিচয় পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এদের বড় একটি অংশই একসময় ছিলেন সাধারণ জেলে বা নৌকার মাঝি। অর্থনৈতিক সংকট ও লোভের কারণে ধীরে ধীরে তাঁরা যুক্ত হন এই সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রে।
এই নেটওয়ার্কে আলোচিত নাম আব্দুল আমিন এবং মাহবুবুর রহমান ওরফে মাম্মা। তাঁরা সম্পর্কে জামাই-শ্বশুর। স্থানীয় সূত্র জানায়, শ্বশুরই প্রথমে মাম্মাকে এই চক্রে যুক্ত করেন। মাম্মা একসময় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরে তিনি এলাকার কিশোর ও তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার কার্যক্রমে যুক্ত করেন এবং অপহরণের ঘটনাতেও তাঁর নাম উঠে আসে। সাবরাংয়ের বাসিন্দা ছৈয়দ আলম বলেন, “জামাই-শ্বশুর মিলে এলাকার অনেক কিশোর ও তরুণকে নিয়ে গেছে। আজ অনেক পরিবার নিঃস্ব। কিন্তু তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
আরেক অভিযুক্ত মো. তাহেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কিশোর ও তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে ট্রলারে তুলে দিতেন। পরে থাইল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে তাঁদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হতো। মাঝেরপাড়ার বাসিন্দা তারেকের বাবা বাদল বলেন, “আমার ছেলেকে জিম্মি করে তাহের তিন লাখ টাকা চেয়েছিল। টাকা দিয়েও ছেলেকে ফেরত পাইনি। এখন সে কোথায় আছে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে কিছুই জানি না।”
আরেক ঘটনায় নিহত রহমত উল্লাহর বাবা ছৈয়দ হোছাইন জানান, “তাহেরই আমার ছেলেকে পাঠিয়েছিল। ট্রলারডুবিতে মারা গেছে—এটা সে স্বীকারও করেছে। আমরা গরিব মানুষ, মামলা করার মতো সামর্থ্য নেই।” তবে অভিযুক্ত তাহের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ লম্বরীর বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম স্থানীয়দের কাছে শীর্ষ অপহরণকারী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে প্রায় ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ অপহরণ করে পাহাড়ি এলাকায় গোপন আস্তানায় রেখে মুক্তিপণ আদায় করে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি অপহরণ, পাঁচটি মানবপাচার এবং তিনটি মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত। উত্তরপাড়ার নিখোঁজ হারুনুর রশিদের বাবা জাফর আহমেদ বলেন, “দালাল সাইফুল আমার ছেলেকে মৌলভী শফিকের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। আমরা চার লাখ টাকা দিয়েও ছেলেকে ফেরত পাইনি।”
আরেক আলোচিত নাম শামসুল আলম ওরফে শামীম (৩৮), যিনি সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০১৯ সালে ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন এবং “আলোর পথে” ফেরার ঘোষণা দেন। তবে পরে তিনি আবার মানবপাচার ও অপহরণ চক্রে যুক্ত হন। তাঁর নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবা ও মানবপাচারকারীদের তালিকায় রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় সাধারণ জেলে শামীম মাছ ধরতে গিয়ে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। পরে শাহপরীর দ্বীপের গোলারপাড়া চর ব্যবহার করে ছোট নৌকায় মানুষ পাচার এবং মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার আজগর আলী ওরফে আজগর মাঝির জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ জেলে হিসেবে। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০০৫ সালে তিনি নৌকাযোগে মালয়েশিয়া পাড়ি জমান। সেখানে প্রায় পাঁচ বছর শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পর ২০১০ সালে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারযাত্রা শুরু হলে তিনি পরিবারকেন্দ্রিক একটি মানবপাচার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
জানা যায়, পাচার কার্যক্রম সহজ করতে তিনি থাইল্যান্ডে বিয়ে করেন এবং সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর জন্য নিজস্ব ট্রলারও সংগ্রহ করেন। ২০১০ সালে তাঁর মাধ্যমে পাঠানো দুটি ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে গেলে প্রায় ৭০ জন নিখোঁজ হন বলে জানা যায়। এরপর থাইল্যান্ডে পাচার হওয়া শ্রমিকদের আটকে রেখে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠলে তিনি মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে আবারও তিনি মাছ শিকার শুরু করেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পুনরায় মানবপাচার চক্রে যুক্ত হন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আজগর আলীর বিরুদ্ধে দুটি মানবপাচার মামলা এবং একটি মাদক মামলা রয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, থাইল্যান্ডে অবস্থানরত কয়েকজন রোহিঙ্গা দাবি করেছেন যে তাঁরা শাহপরীর দ্বীপের ‘আজগর পক্ষ’ হয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। ভিডিওতে তাঁরা অভিযোগ করেন, পাচারচক্রের সদস্যরা তাঁদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং প্রত্যেককে প্রায় দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আজগর আলী। তিনি বলেন, “গত বছর পাঁচ-ছয়জন মানুষ পাঠিয়েছি, তবে এখন এসব করি না। এগুলো আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।” ভিডিওতে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও তিনি দাবি করেন, অন্য দালালরা তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বর্তমানে তিনি নিজেকে মাছ ধরার পেশায় যুক্ত বলে জানান।
সাবরাং কচুবনিয়ার বাসিন্দা আজম উল্লাহ, যিনি আলোচিত নজির আহমদ ডাকাতের ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত, তাঁর বিরুদ্ধেও মানবপাচারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, কাটাবনিয়া নৌঘাট ব্যবহার করে তাঁর সিন্ডিকেট কার্যক্রম চালায়। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাসংক্রান্ত একাধিক মামলাও রয়েছে। একই ঘটনায় সাবরাং হারিয়াখালীর সাদ্দাম হোসেনের নামও উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, ডুবে যাওয়া ট্রলারে মানুষ পাচারের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
অন্যদিকে শাহপরীর দ্বীপ কোনারপাড়ার ইসমাইল (২৮) মাছ ধরার পেশা ছেড়ে মানবপাচারে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সঙ্গে একটি নারী সিন্ডিকেটও সক্রিয় ছিল। গত ৮ এপ্রিলের ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইসমাইলের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোকসানা নামের এক নারীকে পাচার করা হয়। পরে বিদেশ থেকে পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। রোকসানার মা মমতাজ বেগম বলেন, “এক মাস পর থাইল্যান্ড থেকে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় এখনো মেয়েকে ফেরত পাইনি।”
অপহরণ ও মানবপাচার চক্র এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা পেশায় সীমাবদ্ধ নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নেটওয়ার্কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে সাধারণ মুদি দোকানি পর্যন্ত অনেকেই যুক্ত। ফলে সন্দেহের বাইরে কেউই আর নিরাপদ নয় বলে স্থানীয়দের অভিমত।
কক্সবাজার শহরের কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন বা একা যাত্রীদের জন্য এই রুটে ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি বেশি। একাধিক ঘটনার তথ্যেও এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে কর্মরত একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, রাত ৯টার পর মেরিন ড্রাইভ ভয়ংকর রূপ নেয়। তাঁর ভাষায়, সড়কের পাশের বাড়িগুলোতেও অতিথিরা নিরাপদ নন। সন্ধ্যার পর থেকেই অপহরণচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রে শিশু ও নারীদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের কাজ হলো টার্গেট ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করা এবং গতিবিধি নজরে রাখা। অপরিচিত কাউকে লক্ষ্য করলেই তারা প্রথমে যোগাযোগ গড়ে তোলে এবং খাতির জমানোর চেষ্টা করে। এরপর সুযোগ বুঝে তথ্য চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, যার পরপরই অপহরণ ঘটে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে একটা প্রচলিত কথা আছে—এক মাথার দাম ৫০ হাজার টাকা। আবার ট্রলার ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলে তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, যাকে-তাকে ধরে ট্রলারে তুলে দেয়। সূত্র: কালের কন্ঠ
সিভি/এম

