ভোররাত তখনও গভীর অন্ধকারে ঢাকা। সময় প্রায় ৪টা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা। তাতে ছিলেন শিল্পী বেগম (৪০)। তার মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। ব্যাগে ছিল শাশুড়ির জরুরি চিকিৎসার জন্য জোগাড় করা ২৫ হাজার টাকা।
মাত্র কিছুক্ষণ আগে নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল থেকে স্বামীর ফোন আসে। জানানো হয়, শাশুড়ির অবস্থা আশঙ্কাজনক। দ্রুত টাকা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু সেই জরুরি যাত্রাই পরিণত হয় ভয়াবহ এক ঘটনায়।
হাসপাতালের দিকে যাওয়ার আগেই রাস্তায় দুটি মোটরসাইকেল এসে রিকশাটির পথ আটকে দাঁড়ায়। মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত হয় ছয়জন সশস্ত্র যুবক। ঝলকে ওঠে ধারালো অস্ত্র। বাধা দিতে গেলে শিল্পী বেগমের পেট ও পায়ে কোপ দেয় তারা। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি রিকশায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর ছিনতাইকারীরা টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
এই ঘটনা শুধু একজনের নয়, রাজধানীর সাম্প্রতিক বাস্তবতার একটি ভয়াবহ চিত্র। গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক পর্যন্ত ছিনতাই, ছুরি হামলা ও সশস্ত্র অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নগরবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে শুধু ছিনতাই নয়, চুরি, ডাকাতি এবং হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত চার মাসে ঢাকায় ৭৮ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে গত ছয় মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) প্রায় এক হাজার ১০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। শুধু ১ থেকে ৭ মে পর্যন্তই গ্রেপ্তার করা হয় ৭০০ জনকে, যাদের মধ্যে অন্তত ২০০ জন ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। তবে এত গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—অপরাধ কেন থামছে না?
শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদ, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্ত ছিনতাইকারীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।
আগারগাঁওয়ের ঘটনায় আহত শিল্পী বেগমকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার স্বামী ব্যবসায়ী আবদুল হক জানান, কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে স্ট্রোক করা মাকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকেই তারা দৌড়ঝাঁপে ছিলেন। তার ভাষায়, “মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার ছিল। স্ত্রী সেই টাকা নিয়ে বাসা থেকে আসার সময় এ ঘটনা ঘটে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে অনাগ্রহ দেখায়। তার দাবি, ছিনতাইকারীদের নাম না জানালে মামলা হবে না বলে জানানো হয়। পরে শুধু একটি সাধারণ অভিযোগ নেওয়া হয়। তবে শেরেবাংলানগর থানার সংশ্লিষ্ট এসআই জানান, তারা বিষয়টি তদন্ত করছেন। তবে এখনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
আগারগাঁও ছাড়াও মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মালিবাগ, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী ও আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। ১ মে মালিবাগ রেলগেট এলাকায় তিন পোশাক শ্রমিককে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে ছিনতাইকারীরা। ৩০ এপ্রিল শাহবাগে এক বৃদ্ধ দম্পতিকে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। যাত্রাবাড়ীতে জ্যামে আটকে থাকা গাড়িচালককেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
ছিনতাইয়ের পাশাপাশি বাড়ছে গুলি ছোড়ার ঘটনা। ৭ মে মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা একদল সন্ত্রাসী এলোপাতাড়ি গুলি চালালে একজন গুরুতর আহত হন। একই দিনে কদমতলীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে কয়েকজন আহত হন। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
কেন থামছে না অপরাধ?
ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন জানান, গ্রেপ্তার হলেও অনেক ছিনতাইকারী দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে, তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সময় লাগছে।
অপরাধের ধরন ও বাস্তবতা: সূত্র বলছে, রাজধানীতে তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। একদল পেশাদার অপরাধী, যারা পরিকল্পিতভাবে অবস্থান নিয়ে ছিনতাই করে। দ্বিতীয় দল মাদকাসক্ত কিশোর, যারা নেশার টাকা জোগাড়ে দ্রুত ছিনতাই করে পালায়। তৃতীয় দল কিশোর গ্যাং বা ‘অ্যাডভেঞ্চার’প্রবণ তরুণ, যারা মোটরসাইকেলে ঘুরে অপরাধ করে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১০১টি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি, মার্চ ও এপ্রিলে ২৫টি করে মামলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ থানায় অভিযোগ না করায় প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বর্তমানে রাজধানীর সাধারণ মানুষ ফুটপাতে মোবাইল ব্যবহার করতেও ভয় পান। সন্ধ্যার পর বাস বা রিকশায় চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভোরে যাতায়াতকারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ভোরে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই বাড়া নাগরিক নিরাপত্তার জন্য বড় সংকেত। তার মতে, বেকারত্ব, মাদক, অপরাধচক্র এবং দুর্বল নজরদারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সিভি/এম

