ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে মাদক কারবার নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে ডিওবি, এলএসডি ও কিটামিনের মতো ভয়ংকর মাদক সহজেই দেশে প্রবেশ করছে। একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এসব মাদক বিদেশেও পাচার হচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। বিমানবন্দর বা কুরিয়ার সার্ভিসের সাধারণ স্ক্যানিংয়ে এসব চালান ধরা পড়ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেনদেন হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক এই অপরাধ শনাক্তে এখনো কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে গত পাঁচ বছরে মাত্র তিনটি চক্র শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। সর্বশেষ গত ২৫ মার্চ ঢাকার একটি ভাড়া বাসায় গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন জব্দ করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় আসে ডার্ক ওয়েবভিত্তিক মাদক চক্রের সক্রিয়তা।
ডিএনসি মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানিয়েছেন, এই ধরনের অপরাধ শনাক্তের সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোবাইল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে সন্দেহভাজনদের মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণ করে ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টো লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ডিএনসি সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত কিটামিন, ডিওবি ও এলএসডি–এই তিন ধরনের মাদকের তিনটি বড় চালান ধরা পড়েছে। সর্বশেষ অভিযানে ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস থেকে সন্দেহজনক একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। পরে ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকানো ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়। তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে উত্তরায় একটি চক্রের সন্ধান মেলে। এরপর ২৫ মার্চ রাতে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, একটি ‘কি-ওয়ার্ড’ অনুসন্ধানের মাধ্যমে ক্রিপ্টো লেনদেনের সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে উঠে আসে, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ থেকে মাদক সংগ্রহ ও বিক্রি করত। তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে ইলেকট্রনিক ডিভাইসে লুকিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাঠাত। লেনদেন হতো মূলত ‘ট্রন’ নেটওয়ার্কভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।
২০২২ সালের ৫ জুলাই রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নাজমুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে এলএসডির ২৩৮টি ব্লটিং পেপার স্ট্রিপ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, ডার্ক ওয়েব থেকে অর্ডার দিয়ে বিদেশ থেকে এসব মাদক আনা হতো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হতো।
এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৯০টি ডিওবি স্ট্রিপসহ এলএসডি উদ্ধার হয়। তদন্তে উঠে আসে, ওই চালান পোল্যান্ড থেকে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আনা হয়েছিল এবং পেমেন্ট দেওয়া হয়েছিল ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।
ডিএনসির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া শুভ নামে একজন পেশায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার ছিলেন। তিনি অনলাইনে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ডিজাইন বিক্রি করে ডলারে আয় করতেন। সেই অর্থ বিটকয়েনে রূপান্তর করেই মাদক চক্রে যুক্ত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনলাইনভিত্তিক মাদক কারবার দ্রুত বাড়ছে। তবে এটি শনাক্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ছাড়া সফলতা সীমিত থাকবে।
ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন মাদক কারবারের নতুন নিরাপদ মাধ্যম হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

