দেশের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন সন্ত্রাসী চক্র। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতর ও বাইরে অবস্থান নেওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা টার্গেট কিলিং, গুলি ও হুমকির মতো ঘটনাকে ব্যবহার করছে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে। এসব ঘটনায় পুরোনো দাগি আসামিদের পাশাপাশি সামনে আসছে নতুন ও আড়ালে থাকা শুটারদের নামও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হলেই সহযোগীদের ব্যবহার করে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল নির্দেশদাতারা বেশির ভাগ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে একের পর এক হত্যার রহস্য অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিটি কিলিং মিশনের পর চাঁদাবাজির বাজারে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীতে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে এখনো ইজারা বাকি থাকা পশুর হাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি সন্ত্রাসী চক্র। এ পরিস্থিতিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঘিরে নতুন করে কিলিং মিশনের তৎপরতা বাড়ার তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে সানজিদুল ইসলাম ইমন, বাড্ডার মেহেদী হাসানসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর চাঁদাবাজির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে অনাগ্রহী হওয়ায় তদন্তে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কায় অনেকেই গোপনে আপস করে নিচ্ছেন। রাজধানীতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্তাপ না কমায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিদেশি নম্বর থেকে ফোন এলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অনেক ব্যবসায়ী। একই ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরাও।
গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, পোশাক কারখানার ঝুট বাণিজ্য, বাসাবাড়ির ময়লা অপসারণ, ঠিকাদারি ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই সক্রিয় রয়েছে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ফলে বারবার অভিযানের পরও তাদের প্রভাব পুরোপুরি কমছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় তাদের নজরদারিতে রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণেই অনেক সন্ত্রাসী আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, জামিনে থাকা সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নিবিড় নজরদারিতে এনে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জামিনে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে কেন বাড়ে কিলিং মিশন:
আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাব ধরে রাখার দ্বন্দ্ব থেকেই বেশির ভাগ কিলিং মিশনের পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাদের মতে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধই অনেক সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও টার্গেট কিলিংয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, কোনো গ্রুপ চাঁদাবাজির ভাগে হস্তক্ষেপ করলে বা কোনো শুটার ধারাবাহিকভাবে সফল হামলা চালিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাবশালী হয়ে উঠলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রতিপক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। একইভাবে নতুন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা সেখানে বিদ্যমান নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে শুটারদের ব্যবহার করা হয়।
ইজারা ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সক্রিয় থাকে এসব চক্র। পছন্দের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয়ভীতি দেখানো থেকে শুরু করে হামলার মতো ঘটনাও ঘটানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঠিকাদাররা বড় প্রকল্পের কাজ পাওয়ার পর তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। দাবি পূরণে অস্বীকৃতি জানালেই শুরু হয় প্রাণনাশের হুমকি ও কিলিং মিশনের তৎপরতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, শুধু আধিপত্য নয়, অর্থের বিনিময়েও সক্রিয় হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ে অংশ নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। এতে অপরাধচক্রগুলো আরও সংগঠিত হয়ে উঠছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ঈদের চাঁদাবাজিতে উত্তাপ বাড়ছে :
রাজধানীতে গত দেড় বছরের একাধিক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ ঘিরে চাঁদাবাজি ও পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
সবশেষ ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় টিটন হত্যাকাণ্ডের পর আলোচনায় আসে বসিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, শুধু পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নয়, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় ধরনের স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার থেকে লালবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকার একটি দেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। টিটনের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও তদন্তকারীদের সন্দেহের তালিকার বাইরে নেই ইমন।
এদিকে টিটনের পরিবার এ ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান এবং রনি ওরফে ডাগারি রনি। তদন্তকারীরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে পশুর হাট, চাঁদাবাজি ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব রাজধানীর অপরাধ জগতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
শুটার ধরা পড়লেও অধরাই নির্দেশদাতারা:
রাজধানীতে গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় সামনে এসেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ংকর আধিপত্যের চিত্র। তবে অধিকাংশ ঘটনায় শুটার বা সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও হত্যার মূল নির্দেশদাতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে জোড়া খুনের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ সংঘাত। ওই মামলার আসামি পিচ্চি হেলালের নাম পরে টিটন হত্যাকাণ্ডেও উঠে আসে। কিন্তু অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে অবস্থান করেই নিজের নেটওয়ার্ক ও প্রভাব ধরে রেখেছেন তিনি।
এর আগে গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানে গুলি করে হত্যা করা হয় ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে। একই বছরের ২৫ মে বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাড্ডা এলাকায় ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির আধিপত্যকে কেন্দ্র করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুটি গ্রুপের বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত মেহেদী গ্রুপ ও মালয়েশিয়ায় থাকা মাহবুব গ্রুপের দ্বন্দ্ব এসব ঘটনার পেছনে কাজ করেছে। তবে নির্দেশদাতারা দেশের বাইরে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তদন্তে এই হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে বিদেশে পলাতক ইমনের নাম উঠে আসে। একইভাবে তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির এবং পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডেও আন্ডারওয়ার্ল্ড সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তদের অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তারা এখনো অধরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ ঘটনায় মাঠপর্যায়ের শুটার বা হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হলেও মূল পরিকল্পনাকারীরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন। ফলে হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়গুলো অনেক সময় পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে না। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বই প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্ত হওয়া অনেক সন্ত্রাসী আবারও নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এতে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে সংঘাত বাড়ছে। সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে হামলা চালানো হচ্ছে। বর্তমানে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ইমন, পিচ্চি হেলাল ও মেহেদীর পাশাপাশি কিলার আব্বাস, শাহাদাত হোসেন, জিসান আহমেদ, হাবিবুর রহমান তাজ, ইমাম হোসেন এবং খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুর নামও আলোচনায় রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। তিনি জানান, অপরাধী দেশের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই থাকুক না কেন, তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদেশে অবস্থানরতদের নামও প্রয়োজন হলে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

