বহুজাতিক তামাক কোম্পানি জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের (জাপান টোব্যাকো) বিরুদ্ধে প্রায় ১১২ কোটি টাকার শুল্ক ও কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ–মূসক) পরিচালিত নিরীক্ষায় এই অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
পাঁচ বছরে বিপুল ভ্যাট ফাঁকি:
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি গত পাঁচ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৩০৯ কোটি টাকার তামাকপাতা ক্রয় করেছে। এর বিপরীতে উৎসে মূসক বা ভ্যাট বাবদ ৯৮ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়নি। এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে তামাকপাতা ক্রয়ের ওপর কোনো উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা করা হয়। পরে ৩ নভেম্বর দাবিনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে কর্তৃপক্ষ।
নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, মূল্য ও শুল্ক হার বাড়ার আগে সিগারেট মজুত করে পরে বেশি দামে বাজারে সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এই অর্থের ওপর সুদ যুক্ত হলে মোট পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ১১২ কোটি টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এলটিইউ–মূসক। এর মধ্যে ৯৮ কোটি টাকার বেশি উৎসে ভ্যাট এবং ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) বিভাগের কমিশনার মো. আতিকুর রহমান বলেন, তামাকপাতা কেনার ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কাটা বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি। তিনি আরও জানান, শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে সব ভ্যাট কমিশনারেটকে নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং তামাক খাতের সব কোম্পানি নিয়মের আওতায় আনা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্পোরেট ও মিডিয়া রিলেশন কর্মকর্তা কাজী রুবাইয়া ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উৎসে ভ্যাটে ৯৫ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ:
তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কর্তন না করায় প্রায় সাড়ে চার বছরে ৯৫ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি বা অপরিশোধিত ছিল বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ–মূসক)।
ভ্যাট বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী উৎসে মূসক কর্তনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। উৎসে মূল্য সংযোজন কর কর্তন ও আদায় বিধিমালা, ২০২০ এবং ২০২১-এর বিধি-৪ এর উপবিধি (খ) অনুযায়ী, মূসক অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্তে উৎসে ভ্যাট কাটার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এনবিআরের আইনগত ব্যাখ্যা:
এনবিআরের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনের প্রথম তফসিলে তামাকপাতা স্থায়ী অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়। এছাড়া প্রজ্ঞাপনেও উৎসে মূসক কর্তন থেকে পৃথক কোনো অব্যাহতির উল্লেখ নেই। ফলে তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরবরাহ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের উৎসে মূসক কর্তন বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়জুড়ে তা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির কাছে মোট ৯৫ কোটি ৬২ লাখ ৫৬ হাজার ৬ টাকার রাজস্ব দাবি করে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এলটিইউ–মূসক।
বছরভিত্তিক ফাঁকির হিসাব: তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন অর্থবছরে অপরিশোধিত রাজস্বের পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। এর মধ্যে রয়েছে—
- ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের জুন: ২২ কোটি ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ৭৭৪ টাকা
- ২০২১–২০২২ অর্থবছর: ২৪ কোটি ৯২ লাখ ২৭ হাজার ৪০১ টাকা
- ২০২২–২০২৩ অর্থবছর: ২০ কোটি ৪৯ লাখ ১৯ হাজার ৩৭৭ টাকা
- ২০২৩–২০২৪ অর্থবছর: ৪ কোটি ৭১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮৭ টাকা
- ২০২৪–২০২৫ অর্থবছর: ২৩ কোটি ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৩ টাকা
এ বিষয়ে এলটিইউ–মূসক কমিশনার মো. আতিকুর রহমান বলেন, তামাকপাতা কেনার ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন বাধ্যতামূলক হলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। তিনি আরও জানান, একই ধরনের তথ্য আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সব ভ্যাট কমিশনারেটকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে তামাক খাতের সব প্রতিষ্ঠান একই নিয়মের আওতায় আসে।
অভিযোগের বিষয়ে জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্পোরেট ও মিডিয়া রিলেশন কর্মকর্তা কাজী রুবাইয়া ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তামাকপাতা ক্রয়ে আরও আড়াই কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ:
তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) না দেওয়ার অভিযোগে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে আরও প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকার রাজস্ব দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ–মূসক)।
নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে স্থানীয়ভাবে তামাকপাতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তনের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি।
এ কারণে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী ওই সময়ে অপরিশোধিত উৎসে ভ্যাট বাবদ ২ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭৬৭ টাকা আদায়যোগ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। চূড়ান্ত দাবিনামা জারির পর নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ না হলে এর ওপর সুদ আরোপের বিধানও প্রযোজ্য হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশের লিখিত জবাব দেওয়া হয়েছিল। শুনানিতে জেটি ইন্টারন্যাশনালের একজন ব্যবস্থাপক এবং একজন ভ্যাট কনসালটেন্ট উপস্থিত ছিলেন। তারা আগের লিখিত বক্তব্যই পুনরায় উপস্থাপন করেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, কৃষককে জোগানদার হিসেবে ধরে মূসক দাবি করা সঠিক নয়।
তবে এনবিআর ও এলটিইউ–মূসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জেটি ইন্টারন্যাশনাল একটি লিমিটেড কোম্পানি হওয়ায় এবং অপ্রক্রিয়াজাত তামাক কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করায় এটি আইনগতভাবে ‘জোগানদার সেবা’ হিসেবে গণ্য হয়। ফলে এই ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তনের বিধান প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির ১৩টি পৃথক আপত্তির জবাবও বিশ্লেষণ করে এলটিইউ তা নাকচ করে দেয়। এর ভিত্তিতে দুইটি আদেশে মোট ৯৮ কোটি ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭২ টাকার কর চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে।
এনবিআরের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত জেটি ইন্টারন্যাশনাল প্রায় ১ হাজার ৩০৯ কোটি টাকার তামাকপাতা ক্রয় করলেও আইন অনুযায়ী কোনো উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এছাড়া, পুরোনো শুল্ক হারে সিগারেট মজুত করে পরবর্তীতে নতুন বাজেটের বর্ধিত মূল্যে বিক্রির মাধ্যমে অতিরিক্ত রাজস্ব ফাঁকির তথ্যও পেয়েছে তদন্ত দল।
অভিযোগের বিষয়ে জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্পোরেট ও মিডিয়া রিলেশন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিগারেট মজুত ও বিক্রিতে ১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ:
সিগারেটের মূল্যস্তর ও সম্পূরক শুল্ক হার বৃদ্ধির আগে পুরোনো দামে শুল্ক-কর পরিশোধ করে মজুত তৈরি এবং পরবর্তীতে বেশি দামে বাজারে সরবরাহের মাধ্যমে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেড প্রায় ১৩ কোটি ২৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪–২০২৫ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের স্তরভিত্তিক মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক হার পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামনে রেখে ২০২৪ সালের ৫ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির টঙ্গীর মরকুন কারখানা এবং ওয়্যারহাউজ/ডিপোতে মজুত সিগারেটের তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ–মূসক)। পরের দিন ৬ জুন থেকে নতুন মূল্যস্তর ও বর্ধিত শুল্ক হার কার্যকর হয়।
তদন্তে দেখা যায়, ৫ জুন পর্যন্ত পুরোনো মূল্য কাঠামোর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সিগারেটের ওপর মোট ১৫৩ কোটি ৫৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৬ টাকা শুল্ক-কর পরিশোধ করে পণ্য ওয়্যারহাউজে স্থানান্তর করে কিন্তু পরবর্তীতে ৬ জুন থেকে সেই মজুত সিগারেটই নতুন বর্ধিত দামে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে বিক্রি করা হয়। নতুন শুল্ক কাঠামো অনুযায়ী ওই পণ্যের ওপর মোট প্রযোজ্য কর দাঁড়ায় ১৬৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৯২০ টাকা।
১৩ কোটি টাকার ঘাটতির হিসাব:
দুটি কর কাঠামোর পার্থক্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি পুরোনো হারে কর পরিশোধ করায় প্রায় ১৩ কোটি ২৫ লাখ ৯৮ হাজার ৪৪ টাকার রাজস্ব পরিহার করেছে বলে এনবিআরের অভিযোগ। এর মধ্যে রয়েছে—
- সম্পূরক শুল্ক: ১০ কোটি ৯৬ লাখ ১৪ হাজার ৬৮০ টাকা
- মূসক: ২ কোটি ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৩ টাকা
- সারচার্জ: ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬০ টাকা
তদন্তে ক্যামেল কানেক্ট ডার্ক ব্লু, নেভি, শেখ এসএফ, রিয়েল ও কেটুসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা গেছে। এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য এবং শুল্ক-কর পরিশোধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি শুধু মূল্য তালিকা জমা দিলেও সম্পূর্ণ কর পরিশোধের প্রমাণপত্র দিতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত আদেশ জারির পর জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেড আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করে। বর্তমানে মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট
সিভি/এম

