সাভারের আশুলিয়ার গণকবাড়ী এলাকায় ঢুকতেই দূর থেকে চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। সারি সারি ঝকঝকে সুউচ্চ ভবন, কাচঘেরা আধুনিক স্থাপনা, প্রশস্ত রাস্তা, গোলাকার লাইটপোস্ট, সাজানো বাগান আর আকাশছোঁয়া আবাসিক টাওয়ার। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা নগরী বা উচ্চপ্রযুক্তির কমপ্লেক্স।
কিন্তু মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বদলে যায় সেই ধারণা। বিশাল সব ভবন দাঁড়িয়ে থাকলেও নেই মানুষের স্বাভাবিক আনাগোনা। চারপাশে নীরবতা, ফাঁকা করিডর আর ব্যবহারহীন স্থাপনার এক অদ্ভুত পরিবেশ।
এখানে রয়েছে আধুনিক আবাসিক টাওয়ার, ডরমিটরি, অফিস ভবন এবং লিফট—সবই কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কিন্তু বেশির ভাগ ভবনই এখনো ব্যবহারের অপেক্ষায় পড়ে আছে। গবেষণা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা জাতীয় জিন ব্যাংক প্রকল্প এখন অনেকটা অব্যবহৃত অবকাঠামোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি (এনআইবি) ২০১৮ সালে ‘জাতীয় জিন ব্যাংক’ প্রকল্প শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবসহ জীববৈচিত্র্যের জিন সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশের জিনগত সম্পদ রক্ষা করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু সাত বছর পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গবেষণার চেয়ে এখানে বহুতল ভবন নির্মাণই যেন প্রধান অর্জনে পরিণত হয়েছে।
৫০ কোটি থেকে ৫০৪ কোটি টাকায় প্রকল্প:
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরুতে প্রকল্পটি ছিল তুলনামূলক ছোট পরিসরের। প্রায় ৫০ কোটি টাকায় একটি কার্যকর জিন ব্যাংক স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে একের পর এক অবকাঠামো। ল্যাব ভবনের পাশাপাশি নির্মিত হয় কর্মকর্তাদের আবাসিক টাওয়ার, স্টাফ কোয়ার্টার, ভিআইপি ডরমিটরি, পরিচালক বাংলো, সাবস্টেশনসহ নানা স্থাপনা। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫০৪ কোটি টাকায়। এত বিপুল আবাসিক স্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, এনআইবির মূল ভবনের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ১২ তলা জাতীয় জিন ব্যাংক ও ল্যাব ভবন। সামনে ছোট ছোট ঝাউ ও পামগাছের বাগান। চকচকে দেয়ালে বড় অক্ষরে লেখা “জাতীয় জিন ব্যাংক”। দূর থেকে দেখলে এটি অত্যাধুনিক গবেষণা কেন্দ্র বলেই মনে হয়। কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র।
ল্যাব ভবনের পাশেই রয়েছে ১৪ তলা ও ১০ তলার আবাসিক ভবন। কিছু দূরে ২০ তলা ও ১০ তলার স্টাফ কোয়ার্টার। আরও রয়েছে ১০ তলা ভিআইপি ডরমিটরি এবং আলাদা পরিচালক বাংলো। কিন্তু এসব ভবনের অধিকাংশই প্রায় ফাঁকা। বারান্দা নীরব, করিডরে নেই কোনো পদচারণা, নেই দৈনন্দিন জীবনের চিহ্ন। স্থানীয়দের কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলেন, “জিন ব্যাংকের নামে যেন জ্বিনের আবাসস্থল বানানো হয়েছে।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয়েছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। কারণ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। ডিপিপি অনুযায়ী, জিন ব্যাংক পরিচালনায় ২৫৪ জন জনবল প্রয়োজন ছিল। ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তিন ধাপে ৫৮টি পদ সৃষ্টির সম্মতি দেয়। পরে ২০২১ সালের ৬ জুন অর্থ বিভাগ তা কমিয়ে ৪৪টি পদ অনুমোদন করে। তবে সেই পদগুলোর নিয়োগের ছাড়পত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে এনআইবিতে মোট ৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। এর মধ্যে ৫৫ জন কর্মকর্তা এবং ৩১ জন কর্মচারী। অথচ আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রায় ১৮০ জনের জন্য। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই বিশাল অবকাঠামোর বাস্তব প্রয়োজন কতটা ছিল?
সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আশপাশে তুলনামূলক কম ভাড়ায় ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। তাই অনেকেই সরকারি কোয়ার্টারে থাকতে আগ্রহী নন। কোয়ার্টারে থাকলে বেতন থেকে ভাড়া কাটা হলেও বাইরে থাকা তুলনামূলক সস্তা পড়ে।
তাঁদের মতে, জিন ব্যাংকের জন্য আলাদা বড় আবাসিক কমপ্লেক্সের প্রয়োজন ছিল না। বরং একটি আধুনিক গবেষণা ভবনই যথেষ্ট ছিল। মূল গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল ল্যাব সুবিধা, গবেষণা সক্ষমতা এবং তরুণ গবেষকদের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে অগ্রাধিকার গেছে ভবন নির্মাণে।
প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রকল্প তৈরির সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না, তাই বিষয়টি নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ বলেন, “মন্ত্রণালয় করেছে; আমরা শুধু বাস্তবায়ন করেছি।” বর্তমান এনআইবি মহাপরিচালক ড. মো. ছগীর আহমেদ জানান, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামো কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভবনগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

