রাজধানীর ভেতরে জমির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠায় আশপাশের এলাকায় তুলনামূলক কম দামে প্লট কেনার প্রবণতা বেড়েছে। এই সুযোগে ঢাকার উপকণ্ঠে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলছে একাধিক প্রতিষ্ঠান।
এরই একটি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা বসতি’ (আগের নাম পিংক সিটি)। ঢাকার গাবতলীর কাছে সাভারের উত্তর কাউন্দিয়া এলাকায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘এই মাটি আমার, এই জমিন আমার’—এমন প্রচারণার আড়ালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিম্নভূমি, জলাভূমি এবং সরকারি খাল কোনো নিয়মনীতি না মেনে ভরাট করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে জমি বায়না নেওয়া হলেও পরে রেজিস্ট্রি করা হচ্ছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও হামলার ভয় দেখানো হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়াটে লোক দিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি মাঝেমধ্যেই নাম পরিবর্তন করছে। আগে এটি ‘রিভেরা পার্কসিটি’, পরে ‘জেনোভ্যালি হোল্ডিংস লিমিটেড’ এবং ‘পিংক সিটি’ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি ‘বাংলা বসতি’ নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, তারা আগে এই প্রকল্পকে রিভেরা পার্কসিটি ও পিংক সিটি নামে চিনতেন। এখন হঠাৎ করেই পুরো এলাকাজুড়ে ‘বাংলা বসতি’ নামে কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বারবার নাম ও অবস্থান পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় ‘পিংক সিটি’ সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু করেছিল। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এটি ‘বাংলা বসতি’ নামে বিস্তৃত হয়। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ‘বাংলা বসতি’ প্রকল্পের বিক্রয় কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কঘেঁষা আমিনবাজার এলাকায় বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি অবাধে ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা বসতি’র বিরুদ্ধে। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ড্রেজার ও শত শত ট্রাক ব্যবহার করে ওই এলাকায় মাটি ও বালু ফেলা হচ্ছে।
এ ভরাটের মধ্যেই দুই ও তিনতলা বিশিষ্ট একাধিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে প্লট আকারে জমি বিক্রির প্রস্তুতিও চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। প্রকল্পের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর থাকায় মহাসড়ক থেকে ভেতরের কার্যক্রম পুরোপুরি দেখা যায় না। তবে ভেতরে পরিস্থিতি ভিন্ন, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘মরুরাজ্যের’ মতো দৃশ্য তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রকল্পের কারণে আশপাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও দখল করা হয়েছে। সাভারের ছলিপুর এলাকার বাসিন্দা উজির মিয়া ও মহসিন মিয়ার ৬৫ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে ‘বাংলা বসতি’র বিরুদ্ধে। বিএস জরিপ অনুযায়ী দাগ নম্বর ৪৭১১, ৪৭১২ এবং আরএস দাগ নম্বর ৬২০৪-এর এই জমি রাতের আঁধারে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
একই এলাকার নুরুল ইসলামের ৬২০৫ ও ৬২০৮ নম্বর দাগে থাকা ৫২ শতাংশ জমিও দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নুরুল ইসলামের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার উজালার নামে থাকা উত্তর কাউন্দিয়া মৌজার ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ জমিও দখলের অভিযোগ রয়েছে। সিএস ৪৮২, এসএ ৩১৫ ও আরএস ১২২৪ নম্বর দাগ অনুযায়ী নামজারিকৃত এই জমির বৈধ মালিক হিসেবে তাদের দাবি রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, উজির মিয়ার জমি দখলের পর তিনি ভয়ভীতির কারণে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি। তবে নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সাভার থানায় লিখিত অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। গত বছরের ৩১ অক্টোবর নুরুল ইসলাম অভিযোগ করেন এবং গত ১১ মার্চ তাসলিমা আক্তার জিডি দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী দম্পতির দাবি, ‘বাংলা বসতি’র মালিক সালাহ উদ্দিন ২০১২ সালে জমি কেনার জন্য পাঁচ মাস মেয়াদি বায়না করেছিলেন, তবে পরে জমি রেজিস্ট্রি করেননি। একাধিকবার বায়নার টাকা ফেরত নিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি এবং জমির বাকি অর্থ পরিশোধ করেও রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। তাদের আরও দাবি, এই জমি নিয়ে বর্তমানে মামলা চলছে। তবে মামলার ক্ষেত্রে তারা নিয়মিত হাজিরা দিলেও প্রতিপক্ষ পক্ষের মালিক সালাহ উদ্দিন হাজির হন না বলে অভিযোগ করেন তারা।
নুরুল ইসলাম বলেন, জমির খাজনা ও খারিজ সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ন্যায্য মূল্য দিতে চায় না। তারা জোর করে কম দামে জমি নিতে চায়। ন্যায্য মূল্য পেলে জমি দিতে রাজি, অন্যথায় বিক্রি করবেন না বলেও জানান তিনি।
আরেক ভুক্তভোগী উজির মিয়া অভিযোগ করে বলেন, রাস্তার কাছাকাছি থাকা তাদের ৬৫ শতাংশ জমি ২০১২ সাল থেকে ‘পিংক সিটি’ (বর্তমানে বাংলা বসতি) দখলে রেখেছে। তিনি জানান, জমি বিক্রি বা ব্যবহার—কোনোটিই করতে দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। ক্রেতা এলেও তাদের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেয় বলে দাবি করেন তিনি।
উজির মিয়া আরও বলেন, জমির নামজারি করতে গিয়ে তারা দেখেন ৬৫ শতাংশের মধ্যে ৩৩ শতাংশ অনুপস্থিত। তার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত ৩২ শতাংশ জমি দখল করে নেয়। পরে সংশোধনী মামলার মাধ্যমে সেই জমি পুনরুদ্ধার করা হয় এবং আবার ৬৫ শতাংশ হিসেবেই জমি বহাল থাকে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, জমিতে গেলে দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এদিকে একই এলাকার আরেক ভুক্তভোগী সায়েম অভিযোগ করেন, তার একটি ইটভাটা ভেঙে দিয়ে সেখানে রাতে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে জমি দখল করা হয়েছে। তার ভাষায়, প্রায় দেড় কোটি টাকার ইটভাটা ও ৬০ শতাংশ জমি দখল করা হলেও ক্ষতিপূরণ হিসেবে মাত্র ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সায়েম বলেন, ২৫ বছরের পুরোনো ইটভাটা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ নিয়ে একাধিকবার আলোচনায় বসা হলেও আশ্বাস ছাড়া কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কাউন্দিয়ার আরেক বাসিন্দা ও লোকমান মাল্টিমিডিয়া প্রতিষ্ঠানের মালিক লোকমান জানান, তাদের ৭ শতাংশ জমিও ‘বাংলা বসতি’ দখলে রেখেছে। জমিতে কাজ করতে গেলে বাধা দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শুরুতে প্রকল্পের আয়তন ছিল মাত্র ১৫ থেকে ২০ বিঘা। তবে বর্তমানে এটি প্রায় এক হাজার বিঘা এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পুরো এলাকা নিম্নভূমি হওয়ায় বর্ষায় জলাবদ্ধতা থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমেও অনেক জায়গায় পানি জমে থাকে। স্থানীয়রা এসব জমিতে মাছ ধরা ও চাষাবাদের কাজ করতেন।
অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন এলাকার ওপরও মাটি ভরাট করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সাভারের উত্তর কাউন্দিয়া মৌজায় তিতাসের অধিগ্রহণকৃত জমি রয়েছে এবং সেখানে প্রকল্প হলে বিষয়টি ভূসম্পত্তি বিভাগ দেখবে।
পরে ভূসম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, তিতাস সাধারণত ব্যক্তিমালিকানার জমির ওপর দিয়ে পাইপলাইন নেয় না। জমি অধিগ্রহণের পরই পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। তিনি আরও জানান, জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত পরিদর্শন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে আবাসন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, নদী, খাল বা সরকারি জমি ভরাটের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুমোদন নেই। এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, জেলার অধীন সব সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কেউ নদী, খাল বা সরকারি জমি দখল করে ভরাট করতে না পারে। কোনো ধরনের দখল বা ভরাট হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ‘বাংলা বসতি’র অফিস নম্বরে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেদককে সরাসরি অফিসে আসতে বলা হয়। পরে কলাবাগান এলাকায় তাদের অফিসে গেলে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিক কর্মকর্তা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলেও তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে এ সময় এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মিডিয়ার কারণে আবাসন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছেন না এবং গণমাধ্যম কেবল নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, ‘বাংলা বসতি’র চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মো. সালাহ উদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জলাভূমি ভরাট নিষিদ্ধ। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী আমিনবাজারের নিম্নাঞ্চলে এ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বর্ষায় আমিনবাজারের নিম্নাঞ্চল পানি ধারণ করে। পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারির মধ্যেই সেখানে ভরাট চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, নিম্নাঞ্চল ভরাটের বিরুদ্ধে তিনি নিজেও রাজউকে চিঠি দিয়েছেন, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তার মতে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় থাকলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হতো।
ড. খান আরও অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবসায়ীরা প্রকল্প শুরুর আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ‘ম্যানেজ’ করে নেয়। এতে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দখলদারদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আবাসন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে জমি দখল ও বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে জমি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। কেউ বিক্রি করতে রাজি না হলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের কেউ কেউ ব্যবসায়ীদের সহযোগী হয়ে পড়লে ভুক্তভোগীরা আর প্রতিকার পান না। তার মতে, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক পর্যায়ের স্বচ্ছ ভূমিকা থাকলে জমি নিয়ে অনিয়ম ও প্রতারণা অনেকটাই কমে আসত। সূত্র: কালবেলা
সিভি/এম

