বরিশাল নগরের সিঅ্যান্ডবি সড়ক, যা ঢাকা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কের অংশ, সেখানে নির্মিত বিতর্কিত একটি পার্কের অবশিষ্ট অংশ অপসারণ শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ থাকা এই পার্কটি অবশেষে উচ্ছেদ কার্যক্রমে আসে।
২০২২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সিঅ্যান্ডবি রোডের চৌমাথা এলাকায় সড়ক ও জনপথের জমি এবং দুই ব্যক্তির জমি দখল করে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগম পার্ক’ নির্মাণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এটি নির্মাণে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ব্যস্ততম মহাসড়কের পাশে এ ধরনের পার্ক নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এসব সমালোচনার দিকে কর্ণপাত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এবং পরদিন পার্কটির অংশ বিশেষ ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। পরে সিটি করপোরেশন ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালির কারণে বাকি অংশ অপসারণ ঝুলে ছিল।
অবশেষে প্রায় দুই বছর পর নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পার্কের অবশিষ্ট অংশ অপসারণ শুরু হয়। গত বুধবার (১৩ মে) সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের উপস্থিতিতে সিঅ্যান্ডবি রোড চৌমাথা লেক সংলগ্ন এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু করা হয়।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ঢাকা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কের বরিশাল নগর অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক তাদের আওতাধীন। ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত এই মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়ই এই অংশ পড়ায় পার্ক অপসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পার্ক নির্মাণে অর্থ অপচয় এবং অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সিটি করপোরেশন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে বরিশাল নগরের মহাসড়কের একটি বাইলেন এবং দুই ব্যক্তির মালিকানাধীন জমি দখল করে পার্ক নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ তাঁর মৃত মায়ের নামে এর নামকরণ করেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগম পার্ক’। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর পার্কটির উদ্বোধন করা হয়। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পার্ক নির্মাণের সময় মহাসড়কের পাশে থাকা প্রায় ২৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সিঅ্যান্ডবি সড়কের সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের লেকের উত্তর পাড় থেকে কাজীপাড়া সড়কের মুখ পর্যন্ত মূল মহাসড়ক ও বাইলেনের মধ্যবর্তী সড়ক বিভাজক ভেঙে ফেলা হয়। মহাসড়কের বাইলেন অংশে পার্কের কিছু অংশ পড়ায় পাশের ড্রেনও ভাঙা হয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পার্কের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামোর অংশ হিসেবে একটি হোটেল স্থাপনের জন্য হাতেম আলী কলেজের জমিও দখল করে দোতলা গোলচত্বর নির্মাণ করা হয়। এসব কাজে সওজ কিংবা ট্রাফিক বিভাগের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রায় সাড়ে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের জায়গা দখল করে আনুমানিক আট কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটি নির্মাণ করা হয়। এ প্রকল্পের ঠিকাদার ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ সাঈদ আহমেদ মান্না।
শুরু থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজ এ প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসলেও অভিযোগ রয়েছে, তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মালিকরা আদালতের শরণাপন্ন হলে পার্ক নির্মাণের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। তবে সেই আদেশ উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে পার্কটির উদ্বোধন সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে পার্কের আশপাশের ব্যবসায়ী মালিকরা জানান, পার্ক নির্মাণের পর চৌমাথা এলাকায় যান চলাচলে জটিলতা তৈরি হয়। দুই পাশের প্রশস্ত সড়ক পার হয়ে পার্কের সামনে এসে রাস্তা সরু হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
গত ৫ আগস্ট বরিশাল নগরের সিঅ্যান্ডবি রোডের বিতর্কিত পার্কের সব রাইড ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একই দিন নগরের আরও কয়েকটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে পার্কটি ভাঙার ঘটনায় অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেন এবং এটি স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান স্থানীয়রা।
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এই অর্থ সিটি করপোরেশনের তহবিল থেকে দেওয়া হয়, যা তৎকালীন মেয়রের অনুমোদনে ব্যয় হয় বলে তারা উল্লেখ করেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ নগরবাসীর করের টাকা। পরবর্তী সময়ে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর চাচা খোকন সেরনিয়াবাত পার্কটি অপসারণের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।
৫ আগস্টের পরও পার্কটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে পরে বর্তমান প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে নগরবাসী আবেদন করেন। সেই প্রেক্ষিতে অবশেষে পার্ক অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে সিঅ্যান্ডবি রোড চৌমাথা লেক সংলগ্ন এলাকায় পার্কটির অবশিষ্ট অংশ সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, মহাসড়ক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে পার্ক নির্মাণ করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে বাধা থাকলেও তা উপেক্ষা করে এটি বাস্তবায়ন করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরবাসীর পক্ষ থেকে প্রধান দাবি ছিল পার্কটি অপসারণ। যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে পার্কের জায়গা মহাসড়ক অংশ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কাছে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে।
অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, পার্ক নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তা জনগণের। এই ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে এবং এতে অনিয়ম বা লুটপাট হয়ে থাকলে তারও তদন্ত হবে। সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মমূলক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপনের কথাও বলেন তিনি।

