খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়ক নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয়, নিম্নমানের কাজ এবং নকশাগত ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের সংস্কারকাজের ফলে দুই বছরের মধ্যেই পিচ উঠে গিয়ে সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
২০২১–২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়কালে খুলনা সিটি করপোরেশন বাস্তবায়ন করেছে ‘গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা মেরামত ও সংস্কার মেগা প্রকল্প’। এই প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের মান নিয়ে অনুসন্ধানে একাধিক অনিয়ম ও প্রশ্ন সামনে এসেছে। নগরীর শিববাড়ি মোড় থেকে সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ব্যস্ত মজিদ সরণির দৈর্ঘ্য ৮৮০ মিটার। সড়কটির ডান পাশে একই দৈর্ঘ্য ও ৭ মিটার প্রস্থের অংশে বক্স কাটিং, সাব-বেজ কোর্স, প্রাইম কোট, কার্পেটিং ও মার্কিংয়ের কাজ করে খুলনা ওয়াসা। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। হিসাব অনুযায়ী প্রতি বর্গমিটারে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩০৫ টাকা।
একই সড়কের বাম পাশে একই দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অংশে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় খুলনা সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার টাকা। এখানে প্রতি বর্গমিটারে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৮৮ টাকা, যা ওয়াসার তুলনায় প্রতি বর্গমিটারে ১ হাজার ৮৮ টাকা বেশি। প্রকল্পের আওতায় মোট প্রায় ৩০২ কিলোমিটার সড়কে এ ধরনের ব্যয় কাঠামো ধরা হয়েছে।
খুলনা ওয়াসার উপসহকারী প্রকৌশলী প্রশান্ত সমাজপতি জানান, পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের অংশ হিসেবে মজিদ সরণি সড়কে প্রায় ৯টি ম্যানহোল তৈরি ও সংযুক্ত পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এরপর নির্ধারিত রেট অনুযায়ী সাব-বেজ কোর্স, প্রাইম কোট, কার্পেটিং ও মার্কিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন মিলে এ অংশের মেরামতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
অন্যদিকে সড়কের এক পাশে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ের তুলনায় অপর পাশে ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা কেন ব্যয় হলো—এ প্রশ্নে খুলনা সিটি করপোরেশনের উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান মিঠু জানান, সড়কের কিছু অংশ ভাঙা ও গর্ত ছিল। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে ম্যানুয়াল কার্পেটিং করা হয়। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে দেড় মিটার করে আরসিসি ঢালাই দিয়ে প্রশস্ত করা হয়। এ ছাড়া বক্স কাটিং ও বালু ভরাটের কাজও করা হয়েছে। সবশেষে বাম পাশে কার্পেটিং ও মার্কিং সম্পন্ন করা হয়।
ডান পাশে যেখানে ম্যানহোল ও পাইপ বসানোর কারণে তুলনামূলক বেশি ব্যয় হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্য নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিক সংগঠনগুলো পুরো প্রকল্পে ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলে স্বচ্ছতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে একই কাজের জন্য দুই প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শুধু মজিদ সরণি নয়, সামছুর রহমান রোড, টিবি ক্রস রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোডসহ নগরীর বিভিন্ন সড়কে একইভাবে দুই প্রকল্পের অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কেসিসির প্রকল্পের আওতায় ৮৯ দশমিক ৪০ কিলোমিটার সড়কে কার্পেটিং, ১৭৫ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার আরসিসি এবং ৩৭ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার সড়কে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। এ কাজে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৩১ কোটি টাকা। অন্যদিকে খুলনা ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় সড়কে পাইপলাইন স্থাপনের কারণে ক্ষতিপূরণ বাবদ দাবি করা হচ্ছে ৩৭৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দুই প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৯ কোটি টাকা রাস্তা মেরামত খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদ করিম জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের রেট শিডিউল অনুযায়ী ওয়াসা ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেছে। ওই অর্থ দিয়ে খোঁড়াখুঁড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সড়ক মেরামত করা হয়েছে। তবে জানা যায়, ওয়াসার কাছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতি বর্গমিটারে ৯ হাজার ৬১৯ টাকা দাবি করা হয়েছে, যা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের গেজেট অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য নির্ধারিত হার। এই হার খুলনায় প্রয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। তার অভিযোগ, সিটি করপোরেশন ৪৩১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর আবার ওয়াসার কাছে ৩৭৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার জন্য নির্ধারিত গেজেট খুলনায় ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা মানা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, এভাবে প্রকল্পে শতকোটি টাকার অস্বচ্ছতা ঢাকতে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুরো প্রকল্পের ব্যয় ও সমন্বয় প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ।
খুলনা সিটি করপোরেশনের মজিদ সরণি সড়কের মেরামত ও প্রশস্তকরণ কাজ ঘিরে ব্যয়, সমন্বয়হীনতা এবং ঠিকাদার–কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সড়কের ডান পাশে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলে কেসিসি তার অংশের কাজের জন্য নির্ধারিত ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে সম্পন্ন কাজের বিপরীতে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে। পরে অবশিষ্ট কাজের জন্য ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তবে একই অংশে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি ও পুনরায় মেরামত কাজে আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ফলে ৮৮০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কে সমন্বয়ের অভাবে অর্ধকোটি টাকার বেশি অর্থ অপচয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে আরও বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কাজ দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
একই সঙ্গে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লস্কর তাজুল ইসলাম এবং প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের নথিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বড় অংশের কাজ পেয়েছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।
চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হোসেইন ট্রেডার্স প্রায় ৫২ কোটি টাকার কাজ, তাজুল ট্রেডার্স প্রায় ৪০ কোটি টাকার কাজ এবং মেসার্স আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্স প্রায় ৪৫ কোটি টাকার কাজ করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে। বিশেষ করে সাবেক সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বেনামে কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ নেওয়ার অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে উন্নয়ন কাজের বিল উত্তোলনে ঠিকাদারদের কাছ থেকে আধা শতাংশ হারে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। মেগা প্রকল্পগুলোতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হচ্ছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল তোলা বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের ‘গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন’ প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের ডিপিপি ও সংশোধিত প্রস্তাব বিশ্লেষণে ব্যয়, কাজের পরিমাণ এবং নকশাগত ত্রুটি নিয়ে অসঙ্গতি দেখা গেছে।
মূল অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী কার্পেটিং, সড়ক মেরামত ও উন্নয়ন খাতে ৭৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার রাস্তার জন্য বরাদ্দ ছিল ২৩০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে আরও ১০ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার যুক্ত করে মোট ৮৮ দশমিক ৮১ কিলোমিটার সড়কের জন্য ব্যয় ধরা হয় ২৭১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এতে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
অন্যদিকে প্রকল্পের আরসিসি সড়ক মেরামত ও উন্নয়ন খাতে মূল ডিপিপিতে ১৬৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার রাস্তার জন্য ৩১৫ কোটি ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে এই অংশে ১০ দশমিক ৪৯১ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়ে মোট ১৭৪ দশমিক ২৬ কিলোমিটার করা হয়। তবে এতে ব্যয় কমে যায় প্রায় ২ দশমিক ৪৭৭৪ কোটি টাকা।
এই ব্যয় হ্রাসের ব্যাখ্যায় জানানো হয়, চলমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কিছু সড়কের প্রশস্ততা কমে গেছে। কনসালট্যান্টদের পরামর্শে ড্রেন স্ল্যাবকে রোড বিয়ারিং হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে নকশা করা হয়। ফলে কিছু ড্রেনের প্রশস্ততা বাড়াতে গিয়ে সংলগ্ন সড়কের প্রস্থ কমে গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি নকশাগত ত্রুটির ফল। তাদের দাবি, এতে একদিকে সড়কের প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ড্রেন স্ল্যাব একই লেভেলে থাকায় বৃষ্টির সময় ড্রেন উপচে নোংরা পানি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন নাগরিক সমাজ। সিটি করপোরেশনের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ঠিকাদারদের ভূমিকা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, “এগুলো জনগণের টাকা। এই টাকা কীভাবে অপচয় হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কার কী দায়িত্ব ছিল—সবই খতিয়ে দেখা হবে। জনগণের টাকার অপচয় হতে দেওয়া হবে না।”

