রাজধানীর গুলিস্তানের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর-দক্ষিণ মার্কেট। অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে মার্কেটের ছাদে শতাধিক অবৈধ দোকান ও গুদামঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ী সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘর ভাড়া ও জামানতের মাধ্যমে প্রতি বছর কোটি টাকার অনিয়মিত লেনদেন হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনও।
সরেজমিন ঘুরে এবং একাধিক ব্যবসায়ী, নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় মার্কেটের ছাদে টিনশেড ও আধাপাকা ঘর নির্মাণ শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে ওঠে বড় আকারের গুদাম ও দোকান। বর্তমানে উত্তর ও দক্ষিণ অংশ মিলিয়ে ছাদজুড়ে ১৭০টির বেশি ঘর ব্যবহার হচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব স্থাপনা নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কেট মালিক সমিতির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ছাড়াই ছাদের জায়গা দখল করে ব্যবসায়ীদের কাছে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এককালীন জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি প্রতি মাসে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ছাদে যেসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো নিরাপত্তাকর্মীদের বিশ্রামাগার হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশই গুদাম ও দোকান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। সেখানে জুতা, কাপড়, কম্বলসহ বিভিন্ন পণ্য মজুত রাখা হচ্ছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বাড়তি দোকান ও গুদামের চাহিদাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছে।
নিরাপত্তাকর্মীদের ভাষ্যও একই ধরনের। তারা জানান, পুরো ছাদজুড়ে তৈরি হওয়া অসংখ্য কক্ষের মধ্যে মাত্র দুটি রুম তাদের ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। বাকি ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছে। দায়িত্ব শেষে ওই দুই কক্ষেই তাদের বিশ্রাম, খাওয়া ও রাতযাপনের ব্যবস্থা করতে হয়।
মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেন, সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত দোকানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারের কিছু বেশি হলেও বর্তমানে পুরো মার্কেটে দোকান রয়েছে প্রায় তিন হাজার। অর্থাৎ অনুমোদনের বাইরে অন্তত সাত শতাধিক অতিরিক্ত দোকান চালু রয়েছে। এসব দোকানের বেশিরভাগই বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
তারা আরও বলেন, নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছোটখাটো বিষয়েই। অথচ ছাদে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা, অতিরিক্ত দোকান কিংবা অননুমোদিত গুদামের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও।
এদিকে মার্কেটের অনিয়ম, অতিরিক্ত দোকান নির্মাণ ও অর্থ লেনদেন নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে। কমিশনের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মার্কেট কমিটির নেতারা। তাদের দাবি, ছাদে কোনো অবৈধ দোকান বা গুদাম নির্মাণ করা হয়নি। নিরাপত্তাকর্মীদের সুবিধার জন্য সীমিত কিছু কক্ষ তৈরি করা হয়েছে মাত্র। যদিও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে এভাবে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, এটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করে। অতিরিক্ত ভার বহনের কারণে ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার সময় উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র মার্কেটটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অবৈধ আয় করছে। ফলে সাধারণ দোকান মালিকরা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি নষ্ট হচ্ছে পুরো মার্কেটের ব্যবসায়িক পরিবেশ। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

