২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বড় ধরনের অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, আদালতের আদেশে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে মোট ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ২৩ লাখ টাকার অর্থ ও সম্পত্তি জব্দ, অবরুদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই সময়ে বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, কোম্পানির শেয়ার, গাড়ি ও ব্যাংক হিসাব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৩৮ হাজার ৫৯৭ শতাংশ জমি, যার মূল্য ধরা হয়েছে ২ হাজার ২১৬ কোটি ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। একই সময়ে ৪২১টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, যেখানে পাওয়া গেছে ৩২৯ কোটি ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭২ টাকা। এছাড়া বাজেয়াপ্ত সম্পদের তালিকায় রয়েছে ৩৫০ শতাংশ জমি, ২০টি ফ্ল্যাট, ১১টি কোম্পানির শেয়ার এবং ২৩টি গাড়ি। এসবের মোট মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ৩২ হাজার ৬২৮ টাকা।
এছাড়া ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। ওই নির্দেশ অনুযায়ী ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে থাকা অর্থও বাজেয়াপ্ত করা হয়।
সিআইডির জব্দ তালিকায় রয়েছে রাজধানীর গুলশানে বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের পরিবারের একাধিক বিলাসবহুল আবাসন। গুলশান-২ সার্কেলের ৬৮/এ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্তে ৩১ নম্বর বাড়ি ‘বসতি ট্রিপলেট’-এ তিনটি ভবনের মধ্যে দুটি ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট তার দুই ছেলের নামে ছিল। আদালতের নির্দেশে এগুলো জব্দ করে সিআইডি ভাড়া দিয়েছে। সেখান থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা ভাড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে।
একই পরিবারের গুলশানের ৮৪ নম্বর সড়কে থাকা আরেকটি ৬ হাজার ১৯০ বর্গফুটের ফ্লোরও জব্দ করা হয়েছে। তবে সেখানে এখনো কোনো ভাড়াটিয়া পাওয়া যায়নি এবং এটি প্রায় দুই বছর ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। ঢাকার দোহার এলাকায় সালমান এফ রহমান পরিবারের মালিকানাধীন ১ হাজার ৯৬৮ শতাংশ জমি ও নির্মিত স্থাপনাও আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। বর্তমানে ছাত্র–জনতা হত্যা মামলায় তিনি ঢাকার বিশেষ কারাগারে রয়েছেন। এর আগে, গত বছরের শুরুতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের মধ্য দিয়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে সিআইডি।
এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির বলেন, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় সালমান এফ রহমান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের গুলশানের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট মাসিক ১ লাখ টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়েছে, অন্যটি এখনো ভাড়াটিয়া পায়নি। তিনি আরও জানান, জব্দকৃত সম্পদের ভাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার কারণে ভাড়াটিয়া পাওয়া কঠিন হয়, তবে নীতিমালা অনুযায়ী সব সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর সিআইডি বড় পরিসরে অনুসন্ধান শুরু করে। সে সময় বেক্সিমকো গ্রুপ, গাজী গ্রুপ, রংধনু গ্রুপ, বিএসবি গ্রুপসহ একাধিক শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক হিসাব তলব করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়।
পরবর্তীতে অবৈধ অর্থে গড়া সম্পদ শনাক্তে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রেজিস্ট্রি অফিস, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেয় সিআইডি। এসব তথ্য যাচাই–বাছাই শেষে আদালতের অনুমতিতে একের পর এক সম্পদ জব্দ করা হয়।
গাজী গ্রুপের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর সম্পত্তির অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রায় পাঁচ হাজার শতাংশ জমি, গাজী টায়ারের কারখানা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা জব্দ করা হয়।
এর এক মাস পর ঢাকার বনানীতে রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি হোটেল জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে সমবায় ব্যাংকে থাকা তার ৩৪ কোটি টাকা অবরুদ্ধ করে সিআইডি। গুলশান থানায় দায়ের করা মানি লন্ডারিং মামলার ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর আগে ৭ আগস্ট তার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৮৭৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করে সংস্থাটি। ইউনিক গ্রুপসহ আরও কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও মামলা-পরবর্তী তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অবৈধ অর্থে অর্জিত সম্পদ শনাক্ত হলে তা জব্দের জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অনুসন্ধান চলছে। দেশ-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর্থিক অপরাধে সংস্থাটি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শুধু সম্পদ জব্দ নয়, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিচার ও শাস্তির মাধ্যমে সমাজে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে অবৈধ সম্পদ ভোগের সুযোগ নেই। এতে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে।
গত ১৫ মাসে জব্দ হওয়া ৪২১টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাবেক পিএস তৌফিকা করিম ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৭ কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে। তদন্তে জানা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিয়োগ বাণিজ্য, বদলির তদবির, আসামির জামিনসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন। ওই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট, গাড়ি ও জমি কেনা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কসের স্বত্বাধিকারী মো. খায়রুল বাশার বাহারের প্রায় ৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ করে সিআইডি। তদন্তে জানা যায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। সেই অর্থ দিয়ে কেনা ১২২ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমি আদালতের নির্দেশে ক্রোক করা হয়।
পরের মাসে স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্যাম ঘোষের প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, অবৈধভাবে স্বর্ণ কেনাবেচার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও দোকান কিনেছেন। একই সময়ে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তানভির শাকিল জয়ের ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ১ হাজার ২০৮ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। পরে তার হিসাবে থাকা ৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি এবং রনির স্ত্রী ইমরানা জামান চৌধুরীর নামে থাকা মেঘনা ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়। তদন্তে জানা যায়, অবৈধ অর্থ ব্যবহার করে এসব শেয়ার কেনা হয়েছে। এই প্রমাণ পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশে শেয়ারগুলো অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেয় সিআইডি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অবৈধ সম্পদ ক্রোক, ফ্রিজ ও বাজেয়াপ্ত করা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী নীতির অংশ হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আরো বলেন, যার সম্পদের বৈধ উৎস দেখানোর সক্ষমতা নেই, সেটিই অবৈধ সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। কেউ বৈধতা প্রমাণ করতে পারলে সম্পদ ফেরত পাবেন, না হলে রাষ্ট্র তা জনকল্যাণে ব্যবহার করতে পারে।
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা অর্থ যদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা হয়, তাহলে তা একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা দেবে। এতে ভবিষ্যতে দুর্নীতির প্রবণতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

