দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বৈধ লাইসেন্স ছাড়া অন্তত ১৬টি জেনারেল সেলস এজেন্ট বা জিএসএ প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের টিকিট বিক্রি ও কার্গো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি না থাকায় অনিয়ম চলছেই।
বিমান খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং যাত্রী সুরক্ষার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ বৈধ অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সাধারণ যাত্রী বা ব্যবসায়ীদের আইনি সুরক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তথ্য অনুযায়ী, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সাময়িক অনুমতির ভিত্তিতে কিছু জিএসএ প্রতিষ্ঠানকে সীমিত সময়ের জন্য কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়েছিল। সেই অনুমতির মেয়াদ গত ৩১ মার্চ শেষ হয়ে গেলেও নতুন লাইসেন্স ছাড়াই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এসব প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক টিকিট বিক্রি, কার্গো বুকিং এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করছে। এতে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি অর্থ পাচার ও অবৈধ ডলার লেনদেনের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিমান খাত বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক টিকিটিং ও কার্গো সেবা অত্যন্ত সংবেদনশীল খাত। এখানে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হয়। তাই লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স এবং আর্থিক জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, যাত্রীরা সাধারণত বিদেশি এয়ারলাইন্সের টিকিট নির্ধারিত এজেন্ট বা জিএসএ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিনে থাকেন। কিন্তু সেই এজেন্টের লাইসেন্স বৈধ কি না, তা অনেকেই যাচাই করেন না। ফলে টিকিট বাতিল, রিফান্ড জটিলতা বা প্রতারণার ঘটনায় যাত্রীদের বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।
লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধিও। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপগামী বিভিন্ন জনপ্রিয় এয়ারলাইন্সের স্থানীয় জিএসএ প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ কেউ দাবি করেছে, তারা অনেক আগেই লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছে। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনুমোদন প্রক্রিয়া আটকে আছে। আবার কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতেও অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।
এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও লাইসেন্স নবায়নে বিলম্বের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। তবে দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু লাইসেন্স নবায়নের আশ্বাস দিলেই হবে না; দীর্ঘদিন ধরে বৈধ অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা চালানো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় পুরো বিমান পরিবহন খাতে অনিয়ম ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে।
তাদের মতে, এ খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করা, নিয়মিত অডিট পরিচালনা এবং যাত্রীদের জন্য অনুমোদিত জিএসএ তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক পরিসরেও দেশের বিমান খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

