দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বাড়তে থাকা ঘটনায় উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। চলতি বছরের মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে। আরও বহু শিশু ধর্ষণচেষ্টা, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। একের পর এক নৃশংস ঘটনায় এখন সন্তানকে একা বাইরে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন অনেক অভিভাবক।
রাজধানীর এক আইনজীবীর বর্ণনায় উঠে এসেছে বর্তমান সমাজের ভয়াবহ বাস্তবতা। তিনি জানান, কোর্ট থেকে ফেরার পথে একটি অটোরিকশায় উঠতে গিয়ে চালকের পাশে ছোট্ট এক শিশুকে বসে থাকতে দেখেন। জানতে চাইলে চালক বলেন, শিশুটিকে বাসায় একা রেখে যেতে ভয় লাগছিল, তাই সঙ্গে নিয়েছেন। এই ছোট্ট ঘটনাই যেন আজকের বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের মানসিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি—যেখানে বাবা-মা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে এবং ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে আরও তিন শিশুকে। নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে অন্তত দুই শিশু।
শুধু শিশুরাই নয়, নারীদের বিরুদ্ধেও সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসে দেশে ধর্ষণ মামলার সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয়, প্রভাবশালীদের চাপ এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক পরিবার অভিযোগই করে না।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মিরপুরে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা, সিলেট, মুন্সীগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন—দেশ কি ধীরে ধীরে শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ। অনেক মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে গাফিলতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি এবং নারীর প্রতি বিকৃত মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। অনলাইনে সহিংস ও অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতাও শিশু ও কিশোরদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে সচেতনতা বাড়ানো এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তারা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের যৌথ দায়িত্ব।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজের মানসিক নিরাপত্তাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যদি একজন বাবা বা মা সন্তানকে একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পান, তাহলে সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে রাষ্ট্র ও সমাজ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

