মরণব্যাধি এ ভাইরাসের বিস্তার রোধের কোনো পথ জানা ছিল না বিশ্বের বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকদের। লাখো মানুষের মৃত্যু গোটা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্বের বড় বড় ওষুধ কোম্পানি করোনা মোকাবিলার জন্য ওষুধ এবং ভ্যাকসিন আবিষ্কারে দিনরাত পরিশ্রম শুরু করে। এ মহামারির মধ্যে মানুষের অসহায়ত্ব পুঁজি করে প্রতারণা এবং জালিয়াতির এক ঘৃণ্য নজির স্থাপন করে বাংলাদেশের একটি ওষুধ কোম্পানি।
ট্রান্সকম গ্রুপের মালিকানাধীন এসকেএফ এ সময় করোনার মুখে খাওয়ার ওষুধ আবিষ্কারের কথা বলে জ্বরের ওষুধ বাজারে ছেড়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
২০২১ সালের ১০ নভেম্বর এসকেএফ ঘোষণা করে যে তারা করোনা চিকিৎসায় বিশ্বে প্রথম অনুমোদিত ওষুধ ‘মলনুপিরাভির’ বাংলাদেশের বাজারে নিয়ে এসেছে। ওইদিন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের রাজধানীর বনানী কার্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন এ ওষুধের বাজারজাত করার কথা জানানো হয়। সেখানে এসকেএফের একজন কর্মকর্তা বলেন, সব আনুষ্ঠানিকতা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষে তাঁরা ওষুধটি বাজারে এনেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দেড় বছরের বেশি বিশ্বে ৫০ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় এতদিন অনুমোদিত কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ ছিল না। ৪ নভেম্বর এর চিকিৎসায় মলনুপিরাভিরের অনুমোদন দেয় যুক্তরাজ্য। করোনা সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন প্রাপ্তবয়স্ককে সকালে চারটি ও রাতে চারটি ক্যাপসুল সেবন করতে হবে।
বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসন আইন অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা যেতে পারে। কিন্তু এ রকম ভয়ংকর প্রতারণার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসকেএফের এই প্রতারণার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এসকেএফের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা এ বিষয়ে মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ডা. মো. মুজাহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কেবল করোনার ওষুধই নয়, অন্যান্য ওষুধ নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। যেমন এসকেএফ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্য বাজারে দুটি আলাদা ওষুধ বিক্রি করে। Esoral MUPS (ইসোমিপ্রাজল MUPS) এবং Losectil (লোসেকটিল-ওমেপ্রাজল)। দুটি ওষুধের কার্যকারিতা একই, তার পরও কারসাজি করার জন্য একই ওষুধ দুই নামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এ ওষুধ দিয়ে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বাজারে সিন্ডিকেট করে এসকেএফ। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ওষুধের দাম বাড়ানো হয়।
ঔষধ প্রশাসনের নাকের ডগায় এসকেএফ তাদের ওষুধের দাম ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে বিক্রি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিচালক এসকেএফের বাজার সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তারা যেহেতু প্রভাবশালী তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঔষধ প্রশাসন ভয় পায়। এ ছাড়া ঔষধ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এসকেএফের বেশ কিছু ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এই কোম্পানির Ostocal GX (অস্টোক্যাল জিএক্স- ক্যালসিয়াম+ভিটামিন D3) ভিটামিন এবং Xinc B (জিঙ্ক ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স)-এর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফার্মাসিস্টরা। এসব ওষুধের আদৌ কোনো কার্যকারিতা আছে কি না তা পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে বারবার। ফার্মা বিশেষজ্ঞদের মতে চিকিৎসকদের নানানরকম প্রলোভনের মাধ্যমে অপ্রয়োজনে এসব ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয়। কিন্তু এসকেএফের মালিকানায় দুটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে ভয় পায়।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন/কালের কণ্ঠ

