রংপুর বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের অন্তত ২০ জন চিকিৎসক দীর্ঘ সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কেউ বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, কেউ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, আবার কয়েকজনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বছরের পর বছর খালি থাকায় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টানা দুই মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো চিকিৎসক ছয় বছর, আট বছর, এমনকি এক দশকেরও বেশি সময় কর্মস্থলে না থাকলেও তাদের চাকরির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর ফলে পদগুলো শূন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে না এবং নতুন নিয়োগের পথও আটকে আছে।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। সেখানে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ৪২ হলেও বাস্তবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৪ জন। কাগজে-কলমে কর্মরত দেখানো কয়েকজন চিকিৎসক বহু বছর ধরে হাসপাতালে অনুপস্থিত।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কয়েকজন মেডিকেল অফিসার ২০১৯ সাল থেকেই কর্মস্থলে ফিরেননি। তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এসব চিকিৎসককে হাসপাতালে দেখেননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এক চিকিৎসক বর্তমানে রংপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, দূরবর্তী এলাকায় বদলি এবং পদোন্নতি না পাওয়ার কারণে তিনি আর সরকারি কর্মস্থলে ফেরেননি। সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক চিকিৎসকের অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে একজন চিকিৎসক প্রায় ছয় বছর আগে পরিবারসহ কানাডায় চলে গেছেন বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন।
একই ধরনের পরিস্থিতি দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও রয়েছে। বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক প্রায় ১০ বছর ধরে কর্মস্থলে নেই বলে জানা গেছে। তিনি বর্তমানে জাপানে অবস্থান করছেন। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরেক চিকিৎসক কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক মেডিকেল অফিসারও দীর্ঘ সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ঢাকায় অবস্থানের কথা স্বীকার করে প্রয়োজন হলে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগজুড়ে প্রায় ২০ জন চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন না। তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়গুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত থাকার পরও কেন চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসকদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এতে একদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে শূন্য পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নতুন চিকিৎসক নিয়োগও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা মনে করছেন, বছরের পর বছর কর্মস্থলে না থেকেও সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা প্রশাসনিক দুর্বলতার বড় উদাহরণ। তাদের মতে, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

