দেশে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও হয়রানিমুক্ত করতে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল মিলছে না। ডিজিটাল সেবার বিস্তার সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন ভূমি অফিসে এখনো দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমি অফিস ঘুরে নাগরিক হয়রানির উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দালালচক্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট। সেখানে নিয়ম ও প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে অর্থ লেনদেন।
সাধারণ মানুষের জন্য নামজারি, খাজনা পরিশোধ, জরিপ, মাঠ পর্চা সংগ্রহ কিংবা রেকর্ড সংশোধনের মতো মৌলিক সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস ঘুরেও কাজের অগ্রগতি দেখা যায় না। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ প্রদান করলে একই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতির কারণে বৈধ জমির মালিকরাও নিজেদের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে পড়ছেন। জমির রেকর্ড সংশোধন, মালিকানা হালনাগাদ কিংবা খাজনা সংক্রান্ত কার্যক্রমে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।
রংপুরে একই জমি দুই পক্ষের নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মহানগরীর পার্বতীপুর মৌজায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে সাতগড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সহায়তার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়দের দাবি, ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি করে জমি দখলের চেষ্টাও হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে দুর্নীতি ও দালালচক্রের প্রভাব কমেনি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, ভূমি অফিসে অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
রংপুরের সদর উপজেলার আলমনগর মৌজায় একই জমি দুই পক্ষের নামে নামজারি করে মালিকানা দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রংপুর জজ কোর্টের আইনজীবী ও মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ডলাশ কান্তি নাগ বলেন, ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে সাধারণ মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তার মতে, ভূমি খাতের দুর্নীতি এখন জনদুর্ভোগের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে মেহেরপুরে চলমান ভূমি জরিপ কার্যক্রম নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। জমির মালিকদের দাবি, সামান্য ভুল বা অসঙ্গতির অজুহাতে তাদের আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে একই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন অনেক আবেদনকারী।
গাংনী উপজেলার বামুন্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পক্ষে এক বহিরাগত ব্যক্তির মাধ্যমে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত শুরু হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নামজারি, খাজনা ও দলিলসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার জন্য আবেদনকারীদের সরাসরি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, জেলার সব ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো বহিরাগত দালাল যেন অফিসে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বগুড়াতেও ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রমকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবেদনকারীদের দাবি, জমির বৈধ কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও বারবার নতুন নথি চাওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ লেনদেন না হলে ফাইল আটকে রাখা, রেকর্ডে ত্রুটি দেখানো কিংবা শুনানির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো অনিয়ম ঘটছে।
ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ করেছেন অনেক জমির মালিক। তাদের দাবি, সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ান, নিবন্ধিত দলিল, নামজারি এবং কর পরিশোধের রসিদসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও সেগুলোকে ‘অসম্পূর্ণ’ বা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অতিরিক্ত ভোগান্তি। কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একজনের জমি অন্যের নামে রেকর্ড করার চেষ্টাও করা হচ্ছে। ফলে জমির মালিকানা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি বগুড়া মহানগরের মালগ্রাম এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ হেলাল তার জমির খাজনা খারিজের আবেদন নিয়ে সদরের ফাঁপোড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। সেখানে তার কাগজপত্রে বিভিন্ন ত্রুটি দেখানো হয়। পরে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে সদর ভূমি অফিসে জমা দিলেও নতুন করে আরও ভুল ধরা হয়। তার অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাতে আবেদনকারীদের ঘুরিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন প্রত্যাশা তৈরি করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নানা প্রশ্নও। অনেক জমির মালিকের অভিযোগ, জরিপের সময় জমির সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরিমাপ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মালিকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হচ্ছে না। কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে পরে অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ভূমি জরিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকলে ভবিষ্যতে নতুন করে বিরোধ, দ্বন্দ্ব ও মামলার সংখ্যা বাড়তে পারে। অনেকের আশঙ্কা, যথাযথ তদারকি নিশ্চিত না হলে ডিজিটাল সার্ভেও দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সব আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কোথাও অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের জন্য আবেদনকারীকে জানানো হয়।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশাসনিক খাতগুলোর একটি হলো ভূমি ব্যবস্থাপনা। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক বিরোধও বৃদ্ধি পাবে। এমনিতেই দেশে ভূমি মামলার দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে এক প্রজন্ম মামলা শুরু করলেও রায় পেতে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী প্রজন্মকে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভূমি জরিপে ভুল বা অনিয়ম হলে বিদ্যমান সংকট আরও জটিল হয়ে উঠবে। জরিপ কার্যক্রমে কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি দমন, দালালচক্র উচ্ছেদ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

