বিচারহীনতার সংস্কৃতি হলো এমন একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থা, যেখানে অপরাধী তার রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সহজেই শাস্তি এড়িয়ে যায়। এটি ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করে এবং অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি বহুতল আবাসিক ভবনে সাত বছরের অবুঝ শিশু রামিসা আক্তারকে বাথরুমের ভেতরে নিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা কেটে ও হাত পা কেটে হত্যা করা হয়। এই পৈশাচিক ও গা শিউরে ওঠা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া মূল ঘাতক যুবক সোহেল রানা (৩০) এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী যৌথ অভিযানের মাধ্যমে দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে।
দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি তীব্র আক্ষেপ, চরম ক্ষোভ ও গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের ভাগ্যাহত পিতা আবদুল হান্নান মোল্লা। বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি সটান বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে আমার নিষ্পাপ মেয়ে হত্যার কোনো বিচার চাই না। কারণ আমি ভালো করেই জানি— আপনারা এই জঘন্য অপরাধের সঠিক বিচার কোনোদিন করতে পারবেন না। এই দেশে সাধারণ মানুষের ওপর হওয়া পৈশাচিক অন্যায়ের সুষ্ঠু বিচার করার তেমন কোনো অতীত রেকর্ড বা নজির নেই।’
নিজের একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা আরও বলেন, ‘আপনারা এই নির্মমতার আসল বিচার করতে পারবেন না, আর আমার আদরের মেয়েটিও কোনোদিন আমার বুকে আর ফিরে আসবে না। আপনাদের এই বিচার ব্যবস্থার ওপর আমাদের আস্থা রাখার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট উদাহরণ সমাজে নেই। দেশের নিয়ম অনুযায়ী এই বেদনাদায়ক ঘটনাটি নিয়ে বড়জোর আগামী ১৫ দিন চারদিকে ব্যাপক আলোচনা ও লেখালেখি চলবে; এরপর দেশের কোথাও নতুন কোনো বড় ঘটনা বা অঘটন ঘটবে এবং সাধারণ মানুষের নজর সেদিকে চলে গেলে একপর্যায়ে আমার মেয়ের এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডটি চিরতরে ফাইলের নিচে ধামাচাপা পড়ে যাবে।
|
বিচারহীনতার সংস্কৃতির মূল কারণ ও বৈশিষ্ট্য:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে অপরাধ ঘটলেও তার যথাযথ বিচার হয় না এবং অপরাধীরা অনেক সময় দায়মুক্ত থেকে যায়। এর কিছু প্রধান কারণ ও বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো—
প্রভাবশালীদের সুরক্ষা:
বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অতিরিক্ত সুরক্ষা। যখন কোনো অপরাধে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকে, তখন অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এতে তদন্তের গতি কমে যায় বা অনেক সময় তদন্তই বাধাগ্রস্ত হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাক্ষ্য সংগ্রহ, মামলা এগিয়ে নেওয়া কিংবা আদালতে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধের সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতি, প্রভাব বা স্বার্থের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাক্ষীরাও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারেন না। এর ফল হিসেবে অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যায় এবং সমাজে একটি ভুল বার্তা যায়—প্রভাবশালী হলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা সম্ভব। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায় এবং ন্যায়বিচারের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে।
দীর্ঘসূত্রতা:
বিচারহীনতার সংস্কৃতির আরেকটি বড় কারণ হলো বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় বছর থেকে দশক পর্যন্ত লেগে যায়। ফলে ভুক্তভোগীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ দুর্বল হয়ে পড়ে, অনেক সাক্ষী অনুপস্থিত হয়ে যায় বা সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে মামলার গতি আরও ধীর হয় এবং সত্য উদঘাটন কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া মামলার অতিরিক্ত চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতিও বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। অনেক সময় একই মামলায় বারবার তারিখ পড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের আর্থিক ও মানসিক চাপও বেড়ে যায়।
ফলে বিচার পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে সময়ের সুবিধা নিয়ে শাস্তি এড়িয়ে যায়। এতে সমাজে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।
আইনের শাসনের প্রতি অবমূল্যায়ন:
আইনের শাসনের প্রতি অবমূল্যায়ন বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি গুরুতর দিক। যখন সমাজে আইনকে সমান ও সর্বজনীন হিসেবে দেখা হয় না, তখন এর প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা কমে যায়। এ অবস্থায় অনেকেই মনে করে যে আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব বা পরিচয়ের ভিত্তিতে এর প্রয়োগ পরিবর্তিত হয়। ফলে আইনের প্রতি ভয় ও সম্মান দুটোই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর প্রভাবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনকে পাশ কাটিয়ে চলার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আইনের শাসনের প্রতি এই অবমূল্যায়ন পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করে, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করে তোলে।
অপরাধ বৃদ্ধি:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। যখন মানুষ দেখে যে অপরাধ করেও অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, তখন আইনের প্রতি ভয় ও জবাবদিহিতার ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী আরও সাহসের সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
দ্রুত ও নিশ্চিত শাস্তির অভাব অপরাধীদের জন্য একটি ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে, যা অপরাধকে নিরুৎসাহিত না করে বরং উৎসাহিত করে। এতে ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এভাবে বিচারহীনতার পরিবেশ সমাজে অপরাধকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে মানুষ বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। যখন কেউ মনে করে যে আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না, তখন অনেকেই নিজেরাই ‘বিচার’ করার চেষ্টা করে।
এর ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর হামলা, গণপিটুনি বা তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এসব ঘটনা আবেগ ও ক্ষোভের বশে ঘটে এবং এতে আইনগত প্রক্রিয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। অনেক সময় নির্দোষ মানুষও এর শিকার হয়। এ ধরনের প্রবণতা সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। একই সঙ্গে এটি মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘন:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। যখন অপরাধের সুষ্ঠু বিচার হয় না, তখন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হয়।
এ পরিস্থিতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে হয়রানি, ভয়ভীতি বা দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে গুম, খুন ও সহিংসতার মতো গুরুতর ঘটনার ক্ষেত্রেও অনেক সময় কার্যকর বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা দায়মুক্ত থেকে যায়। দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহির অভাবের কারণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে। এতে সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষিত না থেকে বরং দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমশ সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়: বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—তিন স্তরেই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা:
বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো আইনের নিরপেক্ষ ও সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। আইন যেন ব্যক্তি, পদ বা প্রভাবের ভিত্তিতে ভিন্নভাবে প্রয়োগ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিচার বিভাগ ও তদন্ত সংস্থাকে রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। কোনো অপরাধের তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাবান ব্যক্তির চাপ বা হস্তক্ষেপ থাকলে তা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে স্বাধীন রাখা জরুরি। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে। যখন সবাই সমানভাবে আইনের আওতায় আসে, তখন সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা বাড়ে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

