দেশে সংগঠিত অপরাধ, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, পুরোনো অপরাধী চক্রের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সন্ত্রাসীরাও বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। এ বাস্তবতায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিষ্ক্রিয় বা ব্লক করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তাকারী স্বজনদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে মত দেওয়া হয়, শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা নয়, অপরাধীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধার পথও সীমিত করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই এনআইডি নিষ্ক্রিয় করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত ও সক্রিয় সন্ত্রাসীদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। জেলার পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সূত্রের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়, আর্থিক কর্মকাণ্ড, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সন্ত্রাসীর এনআইডি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে তার দৈনন্দিন আর্থিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার, নতুন সিম নিবন্ধন, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় কিংবা পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে অপরাধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো দুর্বল হয়ে যাবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় নতুন অপরাধী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক পুরোনো সন্ত্রাসী আত্মগোপনে চলে গেলে বা অবস্থান পরিবর্তন করলে তাদের জায়গা দখল করে নতুন গোষ্ঠী। এসব গোষ্ঠী দ্রুত চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানকারী কিছু পুরোনো অপরাধীও নতুন সদস্য সংগ্রহ করে নিজেদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
পুলিশের অপরাধ বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে ভাসমান অপরাধীদের বিষয়টিও বিশেষ উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র, বাজার এলাকা, বাণিজ্যিক অঞ্চল ও জনবহুল স্থানে এ ধরনের অপরাধীদের উপস্থিতি বাড়ছে। তারা এক এলাকায় অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত অন্য এলাকায় সরে যাচ্ছে, ফলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিভিন্ন বস্তি ও নিম্নআয়ের জনবসতিতে অপরাধী চক্রের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় অস্ত্র বাণিজ্য, মাদক পাচার, নারী ও শিশু পাচার, ছিনতাই, চুরি এবং ডাকাতির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো এসব এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
সন্ত্রাসবিরোধী এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপরাধীদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা। তদন্তকারীরা বলছেন, বড় অপরাধীদের অনেকেই নিজেদের নামে সম্পদ বা ব্যাংক হিসাব না রেখে স্বজনদের নামে সম্পদ গড়ে তোলেন। ফলে অপরাধলব্ধ অর্থের সুবিধাভোগীদেরও নজরদারির আওতায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে।
তবে এ ক্ষেত্রে আইনগত সীমারেখা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র আত্মীয় হওয়ার কারণে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধের অর্থ ভোগ করছেন বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলেই কেবল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং টেলিযোগাযোগ খাতের সংশ্লিষ্ট ডাটাবেজের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য বহুমাত্রিক যাচাই প্রক্রিয়া রাখা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের পর জেলা প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আলাদাভাবে যাচাই করবে। সব ধাপের অনুমোদনের পরই কাউকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় শীর্ষ অপরাধী, অর্থ পাচারকারী, মানবপাচার চক্রের মূল হোতা এবং বিদেশে অবস্থান করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদেরও নতুন করে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে বিদেশে পলাতক অপরাধীদের তথ্যও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিনিময় করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এনআইডি নিষ্ক্রিয় করার মতো ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধীদের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। তবে একই সঙ্গে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং যথাযথ যাচাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ যেন নিরপরাধ নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করাই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, অপরাধীদের আর্থিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। সেই লক্ষ্যেই এখন তালিকা প্রণয়ন, তথ্য যাচাই এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

