মে মাসজুড়ে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা সহিংস ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, এক মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩১ জন, আর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৩ জন নারী ও শিশু, যাদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
আজ শুক্রবার প্রকাশিত এই তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং নিজস্ব সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির একজন, জামায়াতের একজন, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুইজন এবং একজন সাধারণ নারী।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এসব ঘটনার প্রধান কারণ। এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা বেশি থাকলেও মে মাসে প্রাণহানির ঘটনা বেশি উদ্বেগজনক ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণপিটুনিতে ৩১ জনের মৃত্যু:
মে মাসে গণপিটুনি ও সহিংসতার ৬৬টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ফরিদপুরে গুজব ছড়িয়ে এক যুবককে এবং গাজীপুরে চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। চুয়াডাঙ্গায় এক যুবককে নির্যাতনের পর গরম পানি ঢেলে হত্যার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুন্দরবনে বন বিভাগের গুলিতে এক জেলে এবং জামালপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক যুবকের মৃত্যু ঘটনাকেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত মাসে ২৮টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন:
মে মাসে অন্তত ৩০৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের শিকারদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন শিশু। এছাড়া ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের ৪২ জনই শিশু।
মানবাধিকার পরিস্থিতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, গত তিন মাসে হামের উপসর্গ ও চিকিৎসা সংকটের কারণে সারা দেশে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে, যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মে মাসে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে চার বাংলাদেশি নিহত এবং ২০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়। এ সময় বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন:
মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকি পান। একজন সাংবাদিককে আটক করা হয়।
খাগড়াছড়িতে পুরোনো মামলায় এক সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং চট্টগ্রামে অবরোধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলিতে দুই সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় পাঁচটি মামলায় ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক অগ্রগতির স্বার্থে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে।

